এবারের এসএসসি’র ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে

312

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের ফলাফলে অনেকটাই ধস নেমেছে। দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন এ বছরের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে খারাপ হয়েছে। গড় পাসের হার ও ফলাফলের সর্বোচ্চ সূচক জিপিএ-৫ সবই কমেছে। ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবার মূলত তিনটি কারণে ফল খারাপ হয়েছে। প্রথমত, এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা গত পাঁচ বছরের শিক্ষাজীবনে করোনা মহামারিসহ নানা কারণে বিদ্যালয়ে ক্লাস পেয়েছে কম। দ্বিতীয়ত, ‘প্রশ্ন কঠিন’ হওয়ায় এবার গণিতে পাসের হার কম। তৃতীয়ত, এবার উত্তরপত্র মূল্যায়নে অন্যান্য বছরের চেয়ে ‘কড়াকড়ি’ ছিল। “আগে পাস করাতে বা ভালো ফলের নিশ্চয়তা দিতে নম্বর একটু বাড়তি দিতে বলা হত। যদি এবার তা না হয়, তা পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার কারণ হতে পারে।”

 

এসএসসির ফল প্রকাশ, পাশের হার ৮৩.০৪%

 

 

নিউজ ডেস্কঃ চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ফেল করেছে ৬ লাখ ৬৬০ জন শিক্ষার্থী। গড় ফেল করেছে ৩১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। আগের বছরের তুলনায় ফেলের হার ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি। কমেছে জিপিএ-৫ ধারীর সংখ্যাও। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন। যা গত বছরের তুলনায় ৪৩ হাজার ৯৭ জন কম পেয়েছে। ২০০৯ সালের পর এবারই সর্বনিম্ন ফল। শিক্ষা বোর্ড বলছে, চলতি বছর শিক্ষার্থীদের দেয়া হয়নি অতিরিক্ত নম্বর বা গ্রেস মার্ক। যার ফলে কমেছে পাসের হার ও জিপিএ-৫। এটাই প্রকৃত ফল। এখন প্রশ্ন উঠছে, এই যে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করলো, এর দায়টা কার?

বৃৃহস্পতিবার প্রকাশিত চলতি বছরের ফল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবথেকে বেশি ফেল করেছে গণিতে। ২২ দশমিক ৫৪ শতাংশ। এ ছাড়াও ইংরেজিতে ফেল করেছে ১২.৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী। সবথেকে কম পাস করেছে বরিশাল বিভাগে। গণিতে ৩৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ ও ইংরেজিতে ফেল করেছে ৩০ দশমিক ৩৪ শতাংশ পরীক্ষার্থী।

মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় এবার পাসের হারে ধস নামার পেছনে মোটাদাগে দুই রকমের কারণ সামনে আসছে।

সাদা চোখে পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে বোঝা যাচ্ছে, গণিত ও ইংরেজি বিষয়ে এবার পাসের হার অনেকটা কমেছে। আবার বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ডের তুলনামূলকভাবে বেশি খারাপ হয়েছে।

 

২০২০ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত প্রকাশিত ফলাফলগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এবার ফল সবচেয়ে খারাপ হয়েছে। ২০২০ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত সব বছরেই পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল।

 

তবে বিগত সরকারের সময়ে যেভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হত, তার বদলে এবার ‘যার যা প্রাপ্য তাই দেওয়ায়’ পাসের হারে প্রভাব পড়েছে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

কয়েকজন শিক্ষাবিদ বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে ‘ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে’ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হত, এবার তা হয়নি।

আবার গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থির পরিবেশ, মূল্যস্ফীতির প্রভাবে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটও ফলাফলে প্রভাব রেখে থাকতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ।

চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড়ে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এর আগে ২০০৯ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড়ে ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ পাস করেছিল। এর আগে এই সময়ের মধ্যে ২০১৮ সালে সবচেয়ে কম পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৮ শতাংশ।

চলতি বছর স্কুলের গণ্ডি পেরোনো শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা পাস করা মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

গত বছরে তুলনার এবার গড় পাসের হার কমেছে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ পয়েন্ট। আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭ জন।

গত বছর মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে এবারের এসএসসি ও সমমানই ছিল প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। এবার ৩০ হাজার ৮৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন।

গত বছরের মতই এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে, সব বিষয়ে পূর্ণ নম্বর ও সময়ে। চলতি বছর যে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসেছেন তারা ২০১২ সালে প্রণীত শিক্ষাক্রমে নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়েছিলেন।

রেওয়াজ ছিল ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়ার। কোভিড ১৯ মহামারির জেরে তিন বছর ফেব্রুয়ারিতে এ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হয়েছিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা।

আর এবার গণঅভ্যুত্থানের পর দুই মাস পিছিয়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়েছিল ১০ এপ্রিল। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় গত ১৩ মে। ১৫ থেকে ২২ মে মধ্যে নেওয়া হয় ব্যবহারিক পরীক্ষা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও এ শিক্ষা বোর্ডটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির ফলের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।

 

এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ

গণিত ও ইংরেজিতে বেশি ফেল

 

 

চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গণিত ও ইংরেজিতে পাসের হার অনেকটাই কমে গেছে। গত বছরের তুলনায় এগারোটি শিক্ষা বোর্ডেই ইংরেজি ও গণিতে পাসের হার কম।

গত বছর ঢাকা বোর্ডের ৯৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছিল। কিন্তু এবার এ বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে পাসের হার ৮৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

রাজশাহী বোর্ডে গত বছর ৯৬ দশমিক ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করলেও এবার সে হার ৯৩ দশমিক ১০ শতাংশ।

কুমিল্লা বোর্ডে গত বছর ৯৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করলেও এবার সে হার দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ৭৮ শতাংশে।

চলতি বছর বরিশাল শিক্ষা বোর্ডে ৬৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজিতে পাস করেছেন, যা গত বছর ছিল ৯৩ দশমিক ২২ শতাংশ।

এবার এগারোটি শিক্ষা বোর্ডেই গণিতে পাসের হার কমেছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

ময়মনসিংহ বোর্ডে ৬৪ দশমিক ২৭ শতাংশ শিক্ষার্ধী গণিতে পাস করেছে, গতবছর এ হার ছিল ৮৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।

বরিশাল বোর্ডে গণিতে পাস করেছে ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ শিক্ষার্থী, যে হার গত বছর ছিল, ৯২ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

অন্যান্য বোর্ডগুলোতেও গণিতে পাসের হার গত বছরের তুলনায় কমেছে।

 

 

বোর্ড ২০২৫ ২০২৪ ২০২৩
পাস (%) জিপিএ-৫ পাস (%) জিপিএ-৫ পাস (%) জিপিএ-৫
ঢাকা ৬৭.৫১% ৩৭০৬৮ ৮৩.৯২ ৪৯,১৯০ ৭৭.৫৫ ৪৬,৩০৩
রাজশাহী ৭৭.৬৩% ২২৩২৭ ৮৯.২৬ ২৮,০৭৪ ৮৭.৮৯ ২৬,৮৭৭
কুমিল্লা ৬৩.৬০% ৯৯০২ ৭৯.২৩ ১২,১০০ ৭৮.৪২ ১১,৬২৩
যশোর ৭৩.৬৯% ১৫৪১০ ৯২.৩৩ ২০,৭৬১ ৮৬.১৭ ২০,৬১৭
চট্টগ্রাম ৭২.০৭% ১১৮৪৩ ৮২.৮০ ১০,৮২৩ ৭৮.২৯ ১১,৪৫০
বরিশাল ৫৬.৩৮% ৩১১৪ ৮৯.১৩ ৬,১৪৫ ৯০.১৮ ৬,৩১১
সিলেট ৬৮.৫৭% ৩৬১৪ ৭৩.৩৫ ৫,৪৭১ ৭৬.০৬ ৫,৪৫২
দিনাজপুর ৬৭.০৩% ১৫০৬২ ৭৮.৪৩ ১৮,১০৫ ৭৬.৮৭ ১৭,৪১০
ময়মনসিংহ ৫৮.২২% ৬৬৭৮ ৮৫ ১৩,১৭৬ ৮৫.৪৯ ১৩,১৭৭
মাদ্রাসা ৬৮.০৯% ৯০৬৬ ৭৯.৬৬ ১৪,২০৬ ৭৪.৭ ৬,২১৩
কারিগরি ৭৩.৬৩% ৪৯৪৮ ৮১.৩৮ ৪,০৭৮ ৮৬.৩৫ ১৮,১৪৫
মোট ৬৮.৪৫% ১৩৯০৩২ ৮৩.০৪ ১,৮২,১২৯ ৮০.৩৯ ১,৮৩,৫৭৮

 

 

দুই বোর্ডে ফল খুব খারাপ

 

 

চলতি বছর বরিশাল ও ময়মনসিংহ বোর্ডে গড় পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেকটাই কমে গেছে।

বরিশাল বোর্ডে গড়ে ৫৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে, গতবছর এ হার ছিল ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ।

এ বোর্ডে চলতি বছর ৩ হাজার ১১৪ জন পরীক্ষা জিপিএ-৫ পেয়েছেন, এ সংখ্যা গত বছর ছিল ৬ হাজার ১৪৫ জন।

ময়মনসিংহ বোর্ডে এবার গড়ে ৫৮ দশমিক ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন, যে হার গতবার ছিল ৮৫ শতাংশ।

এ বোর্ডে এবার ৬ হাজার ৬৭৮ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন, গতবছর এ সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ১৭৬ জন।

 

 

‘যথাযথ’ খাতা মূল্যায়ন ও কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা

 

শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি সভাপতি ও ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেছেন, চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার খাতা ‘যথাযথভাবে মূল্যায়ন’ করতে বলা হয়েছিল পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকদের।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের পাস করাতে বা ভালো গ্রেড দিতে নম্বর বাড়িয়ে দিতে পরীক্ষকদের বলা হত বলে আমরা বিভিন্ন সময় শুনতে পেতাম। কিন্তু চলতি বছর আমরা পরীক্ষকদের বলেছি, খাতাগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে। শিক্ষার্থীরা খাতায় যা লিখেছেন সে হিসাবেই নম্বর পেয়েছেন।”

বরিশাল বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক জি এম শহীদুল ইসলামের মতে, ‘যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়ন ও নকল মুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিতে যথাযথ কেন্দ্র ব্যবস্থপনা’ করায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমেছে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবার ফল খারাপ হয়েছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে। আগে পরীক্ষকদের বলা হত, কিছু লিখলেই যেন নম্বর দেওয়া হয়। কিন্তু এবার তেমন নির্দেশনা ছিল না। নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নিতে কেন্দ্র ব্যবস্থাপনাও যথাযথভাবে করা হয়েছে, বারবার কর্মকর্তারা কেন্দ্র পরিদর্শনে গেছেন। এসব কারণে পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে।”

এ ফলের মাধ্যমে শিক্ষার ‘গুণগত মান অর্জন হবে’ বলেও মনে করছেন অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম।

ফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির এ বিষয়ে বলেন, “ভেন্যু কেন্দ্রের মাধ্যমে অনেক সময় বড় স্কুলগুলোর শিক্ষকরা নিজেরাই নিজেদের শিক্ষার্থীদের গার্ডে থাকতেন। এবার হওরাঞ্চল ছাড়া অন্যান্য এলাকায় ভেন্যু কেন্দ্র ছিল না।”

দীর্ঘদিন বোর্ডের পরীক্ষক ও প্রধান পরীক্ষকের দায়িত্ব পালন করা সরকারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র শিক্ষক আবুল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগে পাস করাতে বা ভালো ফলের নিশ্চয়তা দিতে নম্বর একটু বাড়তি দিতে বলা হত। অনানুষ্ঠিকভাবে বোর্ডের কর্তারা এ বিষয়ে বলতেন। যদি এবার তা না হয়, তা পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমার কারণ হতে পারে।”

তবে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডর সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন শিক্ষা বোর্ডে দায়িত্ব পালন করেছি, কিন্তু নিজে চেয়ারম্যান হিসাবে কখনও নম্বর বাড়িয়ে দিতে বলিনি। কোনো পরীক্ষককেও এ নির্দেশনা দিতে দেখিনি। নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে তা গুজব।”

 

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব?

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তন, গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলে।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আগের সরকারে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ফল প্রকাশ করত, এবার তা হয়নি বলে শিক্ষা বোর্ডগুলো ও শিক্ষা প্রশাসন বলছে। আগের সরকার পরীক্ষার ফলকে নিজেদের সাফল্য হিসাবে দেখত।

“গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা প্রশাসনে যারা দায়িত্ব পেয়েছেন তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে মনে হচ্ছে। এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলের পরিসংখ্যানে।”

তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অস্থিরতা ছিল দীর্ঘদিন। আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের মননেও পরিবর্তন হয়েছে। অনেকে ট্রমার মধ্যে ছিলেন। এসব কারণের পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে পারে।”

সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভাবেও পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন এ শিক্ষা গবেষক।

তিনি বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘদিন শিক্ষক সংকট। তাই শিক্ষার্থীদের অনেককেই কোচিংমুখী হতে হয়। মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ভালো নেই। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানের জন্য কোচিং বা শিক্ষা সহায়তার ব্যবস্থা করতে পারেননি। ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হতে পারে।”

 

 

শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ক্লাস পেয়েছে কম

 

 

এবার যারা এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়, তারা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক স্তরের মোট পাঁচ বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সময় বিদ্যালয়ে ক্লাস পায়নি। এর মধ্যে এ বছরের এসএসসির নিয়মিত পরীক্ষার্থীরা ২০২০ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতির কারণে ওই বছরের ১৭ মার্চ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি শুরু হয়েছিল। তখন টানা দেড় বছর ছুটি ছিল। দ্বিতীয় দফায় করোনার কারণে ২০২২ সালের ২১ জানুয়ারি আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি ঘোষণা করে সরকার। সেবারও এক মাস শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

করোনার বন্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণেও অনেক দিন ক্লাস হয়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফলে শিখন–ঘাটতি নিয়েই ওপরের শ্রেণিতে উঠেছে এবং পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা।

 

ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই

 

মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ইংরেজি ও গণিত শিক্ষকদের প্রায় ৮৫ শতাংশেরই সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ২০২৩ সালে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী প্রকাশিত এ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ১৫৮, যা মোট শিক্ষকের ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক ৫ হাজার ২১৮, যা মোট শিক্ষকের ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সে অনুযায়ী ইংরেজির শিক্ষকদের ৯ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বিষয়ভিত্তিক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। আর ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নেই ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের।

মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট গণিত শিক্ষকের সংখ্যা ৬৪ হাজার ১৪৭। তাদের মধ্যে গণিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারী শিক্ষক মাত্র ৩ হাজার ৮৩৬ জন; ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী আছেন ৪ হাজার ৬৪৩ জন; ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। মোট ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। ইংরেজি বিষয়ে একই চিত্র। ইংরেজিতে মাত্র ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ৩ হাজার ১৪৭ জন শিক্ষক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের। মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় মোট ইংরেজি শিক্ষকের সংখ্যা ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক (অনার্স) ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ৪ হাজার ১৫৮; ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ। স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক ৫ হাজার ২১৮; ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সে অনুযায়ী ইংরেজির শিক্ষকদের ৯ হাজার ৩৭৬ জন বা ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ বিষয়ভিত্তিক স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। আর ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর নেই ৮৪ দশমিক ৬ শতাংশের। আর ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ বা ৩ হাজার ১৪৭ জন শিক্ষক স্নাতকই করেননি।