স্বাগত বঙ্গাব্দ ১৪৩৩ যে দিনটি এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় মিলনের সুযোগ তৈরি করতে পারত, সেই সুযোগ গ্রহণ করতে না পারার ব্যর্থতা আমাদের সকলের :: আমাদের মূলধারাকে গ্রামীণ ও সেকেলে হিসেবে অবমূল্যায়ন করে আধুনিকতার নামে অপরকে অনুকরণ করে তৃপ্তিলাভ করছি।
ঢাকাঃ পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। দিনটি বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সঙ্গে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নেয়। পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সার্বজনীন লোকোৎসব। পহেলা বৈশাখ উদযাপনের শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার মুসলিম মাহিফরাস সম্প্রদায়ের হাতে। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশের প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ছুটির দিন। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা দিনটি নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করার উপলক্ষ হিসেবে বরণ করেন।
এই উৎসবটি শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তা-ইলিশ খাওয়া, হালখাতা, খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হলেও বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য ছিল ‘শুভ নববর্ষ’। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে বৈশাখী শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। তবে আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিবর্তন হতে শুরু করেছে বৈশাখের রীতি। যুক্ত হচ্ছে কনসার্ট এবং যেখানে চর্চা হচ্ছে বিদেশি সংস্কৃতি।
এই দিনটি লোকজ সংস্কৃতি, বাউল গান, জারি-সারি ছিল এই উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। তবে সময়ের সাথে সাথে এই চিত্রে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। বর্তমানে পহেলা বৈশাখ একটি সার্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসবে পরিণত হয়েছে। যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে শহর, বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা। প্রতিবছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আয়োজিত বৈশাখী শোভাযাত্রা এখন এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া ছায়ানটের আয়োজনে রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান পহেলা বৈশাখের আধুনিক উদযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। শহুরে জীবনে রঙিন পোশাক, পান্তা-ইলিশের আয়োজন, কনসার্ট এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় এই দিনে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরায়ণ, বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তির প্রসারের ফলে পহেলা বৈশাখের উদযাপন পদ্ধতিতে এই পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ এই উৎসবকে আরো বিস্তৃত করেছে। তবে এই আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে প্রাচীন অনেক ঐতিহ্য। গ্রামীণ মেলা, লোকসংগীত এবং হালখাতার মতো চর্চা, মেলা এখন আগের মতো চোখে পড়ে না। সাংস্কৃতিক বিশ্লেষকদের মতে, উৎসবের জাঁকজমক বাড়লেও এর মূল ঐতিহ্য ধরে রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পহেলা বৈশাখ প্রাচীন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক অনন্য মেলবন্ধন। সময়ের পরিবর্তনে এর রূপ বদলালেও, বাঙালির হৃদয়ে এই উৎসবের গুরুত্ব এখনো অটুট রয়েছে।
জানা যায়, বাংলা সন এক ধরনের সৌর পঞ্জিকা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য ০ ডিগ্রিতে অর্থাৎ মেষ রাশিতে প্রবেশের দিনকে বাংলা বছরের প্রথম দিন ধরা হয়। বৈশাখ মাসের প্রথম দিন সূর্য মেষ রাশিতে অর্থাৎ ০ ডিগ্রিতে প্রবেশ করে তাই পহেলা বৈশাখকে বাংলা বছরের প্রথম দিন ধরা হয়। সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা ১২ মাস অনেক কাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, বঙ্গ, কেরল, মণিপুর, নেপাল, ওড়িশা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অনেক আগে থেকেই পালিত হতো। এখন যেমন নববর্ষ নতুন বছরের সূচনার নিমিত্তে পালিত একটি সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে, এক সময় এমনটি ছিল না। তখন নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ আর্তব উৎসব তথা ঋতুকালীন উৎসব হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ, কারণ প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকদের ঋতুর ওপরই নির্ভর করতে হতো।
ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরী সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলতো না। এতে অসময়ে কৃষকদের খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনি মূলত প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। সম্রাটের আদেশ মতে রাজকীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ৯৯২ হিজরীতে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় অর্থাৎ ৫ নভেম্বর-১৫৫৬ থেকে।
প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। তখন প্রত্যেককে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সকল খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে বাধ্য থাকত। এর পর দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এই উৎসবটি একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয় যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এ পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এই দিনের প্রধান অনুষ্ঠান ছিল হালখাতা তৈরি করা।
বাংলাদেশে ১৯৬৬ সালে মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হওয়া ১৯৬৬ সালের একটি কমিটিতে পুরোনো বাংলা দিনপঞ্জিকে সংশোধিত করা হয়। এখানে প্রথম পাঁচ মাসকে ৩১ দিন, আর বাকি মাসগুলোকে ৩০ দিন বানানো হয়। প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাসে ৩১ দিন ধার্য করা হয়। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে এই দিনপঞ্জি গ্রহণ করা হয়। এরপর জাতীয় দিনপঞ্জির সূচনা ও প্রতিবছর নববর্ষ ১৪ এপ্রিলেই হয়ে থাকে।
নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামা-কাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোনো খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানা ধরনের কুটিরশিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠাপুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে। এই দিনের একটি পুরোনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এর মধ্যে নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা কিংবা কুস্তি একসময় প্রচলিত ছিল। বাংলাদেশে এ রকম কুস্তির সবচেয়ে বড় আসরটি হয় ১২ বৈশাখ, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে, যা জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু বর্ষবরণের সংগীতানুষ্ঠান ঢাকার রমনা পার্কের রমনা বটমূলে অনুষ্ঠিত হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর তারিক মনজুর ইনকিলাবকে বলেন, পহেলা বৈশাখের বর্তমান আয়োজন পুরোপুরি নাগরিক চর্চায় রূপান্তর লাভ করেছে। টেলিভিশন চ্যানেল ও পত্রিকার সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেও শহুরে নাগরিকদের অংশগ্রহণ ও অনুষ্ঠান প্রাধান্য পায়। যে দিনটি এ দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় মিলনের সুযোগ তৈরি করতে পারত, সেই সুযোগ গ্রহণ করতে না পারার ব্যর্থতা আমাদের সকলের।
প্রফেসর তারিক মনজুর প্রশ্ন রাখেন, সময়ের ব্যবধানে আমাদের নিত্য ব্যবহার্য উপাদান বদলাবে, মানুষের জীবনধারা বদলাবে, চিন্তা-চেতনায়ও বদল ঘটবে, কিন্তু আদৌ কি কোনো কিছুকে ‘আমাদের’ বলে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি? আবহাওয়া ও প্রকৃতির উপযোগী আমাদের নিজেদের পোশাক কোথায়? কোথায় আমাদের নিজেদের গান? আমাদের মূলধারাকে ‘গ্রামীণ’ ও ‘সেকেলে’ হিসেবে অবমূল্যায়ন করে আধুনিকতার নামে ‘অপর’কে অনুকরণ করে তৃপ্তিলাভ করছি!
১ বৈশাখের প্রধান অনুষ্ঠানগুলো : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সকালে বৈশাখী শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ সংগীত। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সকালে বৈশাখী শোভাযাত্রা, দুপুরে মধ্যাহ্নভোজ, সন্ধ্যায় গান, পুতুল নাচ, গাজী পাটগান। ক্যাফে বাজার (পান-প্যাসিফিক সোনারগাঁও) এ বৈশাখী ফুড ফেস্টিভ্যাল। সিলেটে আর্টস কলেজ ও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।



