নির্বাচন বিতর্কে পোস্টাল ব্যালটের ভোট

84

 

 

 

ঢাকাঃ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বের ১০৪টি দেশ থেকে মোট নিবন্ধন করেছেন ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার। এর মধ্যে দেশের বাইরে থাকা প্রবাসী ভোটারদের সংখ্যা সাত লাখ ৬০ হাজারের বেশি। অনেক আসনে পোস্টাল ভোটের সংখ্যা ১০ হাজারের বেশি, যা সরাসরি জয়-পরাজয়ের ফল নির্ধারণ করতে পারে। আগামী ২১ থেকে ২৫ জানুয়ারি পোস্টাল ব্যালটে ভোট গ্রহণ হবে। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করছে, যদি এই ভোট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে ফলাফল নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে। পোস্টাল ব্যালটের নকশা নিয়েও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। নকশা নিয়ে বিএনপির অভিযোগ, ব্যালট ভাঁজ করলে তাদের প্রতীক ‘ধানের শীষ’ মাঝখানে পড়ে যায় এবং সহজে চোখে পড়ে না। বিদেশে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রভাবে তাৎক্ষণিক গোপনীয়তা রক্ষা না করেই ভোটারকে প্রভাবিত করা হচ্ছে। জানা গেছে বিদেশে জামায়াত নেতার হাতে ব্যালটের বান্ডিল, ৩১টি আসনে প্রবাসী ভোটার ৫ হাজারের বেশি হওয়ায় জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব ফেলতে পারে?

তবে বিদেশে পাঠানো পোস্টালের গোপনীয়তা ও ভোট প্রদান পদ্ধতির আচরণবিধি মানছে না ভোটাররা। রাজনৈতিক মহলে আশঙ্কা রয়েছে একই ঠিকানা ব্যবহার করে একাধিক ভুয়া রেজিস্ট্রেশন, ভোটারদের এনআইডি ও আর্থিক তথ্য সংগ্রহ করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো অকাট্য প্রমাণ সামনে আসেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসী ভোটারদের এরকম অসংখ্য ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভোটারদের প্রভাবিত করে তাৎক্ষণিক ভোট প্রদানের ঘটনাটিও দেখা যায় এসব ভিডিওতে। গতকাল পোল্যান্ডের প্রবাসী মোহাম্মদ ইয়াসিন মিয়া (কুমিল্লার ভোটার) তার পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করলে তা ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে তিনি লিখেন, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। তাও আবার ইউরোপ থেকে। দাঁড়িপাল্লা ইনশাল্লাহ। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি হলুদ বলপেন দিয়ে ব্যালট পেপারের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে টিক চিহ্ন দিচ্ছেন এবং গণভোটের ব্যালটে হ্যাঁ ভোট দিচ্ছেন। ভিডিওটির সাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রচারণার গানটি।

 

 

আমেরিকার প্রবাসী ফেরদৌস আহমেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন, তার নিবন্ধিত পোস্টাল ব্যালটটি তার ঠিকানায় না পৌঁছিয়ে রিসিভড হয়েছে অন্য কোনো স্থানে। ব্যালট ট্যাকিংয়ে তিনি এটি দেখে হতাশা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক পোস্টে বলেন, অনলাইনে দেখা যাচ্ছে আমার বাসায় ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে কিন্তু আমি তেমন কিছুই পাইনি দেখে অনলাইন ট্রাকারে চেক করে দেখি এই আপডেট। তিনি বলেন, প্রকৃত ভোটারের অবস্থা বুঝুন এবার। বাহরাইনের মতো আমাদের ব্যালট হয়তো পোস্ট হচ্ছে কোনো এক নির্দিষ্ট ঠিকানায়। তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের এক মাস আগেই ভোটচুরি? আমেরিকান ভোটারদের সাথে এমন হলে মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ ভোটারদের কি ঘটছে কল্পনা করে নিন। এমনকি কোনো কমপ্লেইন করার হটলাইন কিংবা চ্যাটলাইনও নেই ওয়েবসাইটে।

 

সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় বাহরাইনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর। ভিডিওতে দেখা গেছে, একটি বাসায় একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক পোস্টাল ব্যালট রাখা হয়েছে এবং কয়েকজন ব্যক্তি বাহরাইনের ঠিকানা-সংবলিত ব্যালট গণনা করছেন। অভিযোগ ওঠে, এটি একটি রাজনৈতিক দলের (জামায়াতে ইসলামী) নেতার বাসা। এ বিষয়ে ইসির পক্ষ থেকে গতকাল ব্যাখ্যা দিয়েছেন ইসির সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেন, বাহরাইনের পোস্টাল সিস্টেম বাংলাদেশের মতো নয়। সেখানে প্রায় ১৬০টি ব্যালট একটি বক্সে রাখা হয়েছিল, অনেকটা ছাত্রাবাসের চিঠির বক্সের মতো। তিনি দাবি করেন, ভিডিওতে কোথাও কোনো খাম খোলা হয়নি। তারা আনন্দে এমনটি করেছে। পরে বিষয়টি নিশ্চয়তা দিয়ে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেয় ইসি।
রাজনৈতিক প্রচারণা বা গোপনীয়তা রক্ষা না হলে নির্বাচন কমিশন শাস্তির নির্দেশ দিয়েছে, পোস্টাল ব্যালটের খামের ওপর কোনো লেখা, প্রতীক বা রাজনৈতিক বার্তা থাকলে তা দ-নীয় অপরাধ। এমনকি ভোটারের এনআইডি ব্লক করা হতে পারে। এই নির্দেশে থাকার পরও ইসি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না । দেশে অবস্থানরত ভোটারদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

 

 

এই ভোটে সংশ্লিষ্ট আসনে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা : জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে ফেনী-৩ আসনে ১৬ হাজারেরও বেশি সংখ্যক প্রবাসী নিবন্ধন করেছেন পোস্টাল বিডি অ্যাপে। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে ১৪ হাজারেরও বেশি ভোটার পোস্টাল ভোট দিতে নিবন্ধন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় আসনভিত্তিক। সাধারণত আসনগুলোতে জয়-পরাজয়ে ভোটের ব্যবধান বেশ বড় থাকে আবার হাজারের কমও হয়।

এবার আসনভিত্তিক হিসাবে দেশ-বিদেশ মিলিয়ে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে ১০ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন আছে ১৮টি। এর মধ্যে একটি ছাড়া সব আসনই চট্টগ্রাম বিভাগে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিবন্ধন হয়েছে ফেনী-৩ আসনে, ১৬ হাজার ৩৮ জন। সাড়ে ১২ হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো: চট্টগ্রাম-১৫ (১৪ হাজার ২৭২), কুমিল্লা-১০ (১৩ হাজার ৯৩৮), নোয়াখালী-১ (১৩ হাজার ৫৯২), নোয়াখালী-৩ (১২ হাজার ৭৪৫) এবং ফেনী-২ (১২ হাজার ৫৪১) আসন। ১০ হাজারের বেশি ও সাড়ে ১২ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন, এমন আসনগুলো হলো: কুমিল্লা-৪, ৫, ৬, ৯ ও ১১, সিলেট-১, চাঁদপুর-৫, নোয়াখালী-৪ ও ৫, ফেনী-১, কক্সবাজার-৩ ও লক্ষ্মীপুর-২ আসন।

 

 

এ ছাড়া পাঁচ হাজার থেকে শুরু করে ১০ হাজারের কম ভোটার নিবন্ধন করেছেন এমন আসন আছে ৯৭টি। বাকি আসনগুলোতে পোস্টাল ভোট দেয়ার জন্য নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা পাঁচ হাজারের কম। এর মধ্যে সবচেয়ে কম এক হাজার ৫৪৪ জন ভোটার নিবন্ধন করেছেন বাগেরহাট-৩ আসনে। এদিকে ৪৬টি আসনে পাঁচ হাজারের বেশি এবং ৬৬টি আসনে চার হাজারের বেশি ভোটার নিবন্ধন করেন। সব মিলিয়ে ১১৬টি আসনে পাঁচ হাজারের বেশি পোস্টাল ভোট, যা ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।