বিগত ২০ বছরের মধ্যে উচ্চ মাধ্যমিকে সবচেয়ে খারাপ ফলাফলের কারণ কী?

301

বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক বা এইচএসসি পরীক্ষায় গত ২০ বছর ধরে গড় পাশের হার ৬০ শতাংশের ওপরে ছিল। বিশেষ করে করোনা মহামারির পর গত চার-পাঁচ বছরে গড় পাশের হার ছিল ৮০ শতাংশের আশপাশে। সেই বিচারের এবারের ফলকে ‘বিপর্যয়’ মনে করছেন অনেকে।

 

এইচএসসিতে পাশের হারে এবারও এগিয়ে মেয়েরা
                                  এইচএসসিতে পাশের হারে এবারও এগিয়ে মেয়েরা

ঢাকাঃ চলতি ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাশের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

অর্থাৎ এবছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছেন, সংখ্যার হিসেবে যা পাঁচ লাখের বেশি।

এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উত্তীর্ণ হতে না পারার বিষয়টি ঘিরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

যদিও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ বলছে, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার খাতায় যতটুকু বা যেরকম লিখেছে, মূল্যালয়ের পর সেটিই প্রতিফলিত হয়েছে গড় রেজাল্টে।

 

  • এইচএসসি পরীক্ষা

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগে ২০০৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিকে গড় পাশের হার ছিল ৫৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এরপর এবারই তার চেয়ে কম পাশ করলো।

এবছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় জিপিএ-৫ এর সংখ্যায় বেশ কমেছে। বিশেষ করে

আগের বছরের প্রায় দেড় লাখ জিপিএ ফাইভের বিপরীতে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী।

তাহলে গত দুই দশকে উচ্চ মাধ্যমিকের ফলাফলে পাশের হার ও জিপিএ-র সংখ্যা বাড়ার যে ধারা দেখা গিয়েছিল সেখানে ছেদ পড়লো কেন?

এর আগে মাধ্যমিকের ফলাফলেও এমন প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।

সে সময় সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করে, গ্রেস মার্কিয়ের মাধ্যমে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ভালো ফলাফল দেখানো হতো।

তাহলে এখন কি সঠিকভাবে খাতা মূল্যায়ন করা হচ্ছে?

এমন প্রশ্ন তুলে শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বলছেন, অতীতে বেশি নম্বর দিয়ে ভালো ফলাফল দেখানোর চেষ্টা কিংবা এখন সঠিক মূল্যায়নের দাবি করে ফলাফল খারাপ যেটিই হোক না কেন, এর মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা যা শেখার কথা সেটি তারা কি শিখছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলছেন, ফলাফল খারাপ বা ভালো হওয়ার পেছনে কেবল রাজনৈতিক কারণ খুঁজলেই হবে না।

“শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া কতটা হচ্ছে, শিক্ষকরা আসলে ক্লাসে পড়ান কিনা, এগুলোও দেখা দরকার,” বলেন তিনি।

মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী

                     পাশের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে এবছর (প্রতীকী ছবি)

এইচএসসির ফলাফল এমন কেনো হলো

 

এবছর উচ্চ মাধ্যমিকে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাশ করতে পারেনি। যে সংখ্যা মোট অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেকের মতো।

বোর্ডভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এ বছরের মোট পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে কম, ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এছাড়া বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭, রাজশাহীতে ৫৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ এবং যশোরে ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছেন।

এবছর এইচএসসি পরীক্ষায় ২০২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও।

এমন ফলাফলের কারণ কী? কেন এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হলেন?

এর কারণ হিসেবে বারবার শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতিকে দায়ী করছেন কুমিল্লার হোমনা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক তবারক উল্লাহ।

এছাড়া পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা ও খাতা দেখার ক্ষেত্রে বাড়তি কড়াকড়ি আরোপের প্রভাবও এবারের ফলাফলে পড়েছে বলে মনে করেন এই শিক্ষক।

বিবিসি বাংলাকে মি. উল্লাহ বলেন, এবার ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি অকৃতকার্য হওয়ার প্রভাব পড়েছে সার্বিক ফলাফলের ওপর।

মাগুরার বনশ্রী রবীন্দ্র স্মরণী কলেজের শিক্ষক আশিষ কুমার বিশ্বাস অবশ্য মনে করেন, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং এআই নির্ভর সংক্ষিপ্ত বা টোটকা লেখাপড়ার সুযোগ শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার সক্ষমতা ও মনোযোগে ঘাটতি তৈরি করেছে, যা ফেল করার একটি অন্যতম কারণ।

এছাড়া অতীতের মতো পাশ করানোর জন্য গ্রেস মার্ক বা ‘সহানুভূতি মার্ক’ বন্ধ করে দেওয়ায়ও অনেক শিক্ষার্থী কৃতকার্য হতে পারেননি বলেও মনে করেন তিনি।

তবে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা তাদের প্রাপ্য নম্বরই পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ড. সি আর আবরার।

আজ সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এখন থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা যেটুকু খাতায় লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়া হবে এবং কাউকে বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেওয়া হবে না।

“দেশের শিক্ষার মূল সংকট প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হয়। সেই ঘাটতি বছরের পর বছর জমা হয়। দীর্ঘদিন আমরা সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হইনি। আমরা এমন এক সংস্কৃতি গড়ে তুলেছি যেখানে সংখ্যাই সত্য হয়ে উঠেছে। পাশের হার সেখানে সাফল্যের প্রতীক, আর জিপিএ-৫ এর সংখ্যা তৃপ্তির মানদণ্ড।”

“ভালো ফলাফল দেখাতে গিয়ে আমরা অজান্তেই শেখার প্রকৃত সংকট আড়াল করেছি। সেই সংস্কৃতির পরিবর্তন চাই। আমি চাই, শিক্ষা ব্যবস্থা আবারও বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করুক,” বলেছেন তিনি।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
                    দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কারের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

বিপর্যয় নাকি বাস্তবতা?

 

গত দুই দশকের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো এইচএসসি পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের ওপরে ওঠে পাশের হার। ২০০৬ সালের গড় পাশের হার ৬০ শতাংশের কোটা পার করার পর আর কখনই এর নিচে নামেনি।

বিভিন্ন সময় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠা নামা করলেও করোনাকালীন শতভাগ অটোপাশ এবং এর পরবর্তী সময়ে পাশের গড় হার ছিল ৮৫ ও ৯৫ শতাংশের ঘরে। সবশেষ ২০২৪ সালে গড় পাশের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

এবছর এইচএসসির ফলাফল এমন হওয়ার কারণ হিসেবে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, ওভারমার্কিং করার জন্য কাউকে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি, জোর করে বেশি পাশের হার দেখানোর বিষয়ে আগ্রহ ছিল না।

ফলাফল প্রকাশের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাস করল না, এটা তো কাঙ্ক্ষিত নয়। এই বিষয়টিতে আমরা একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। তাতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, গলদ আছে, অবশ্যই গলদ আছে। সেই গলদের জায়গাগুলো ঠিক করতে হবে।”

শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদের কথা বলছেন শিক্ষাবিদ ও গবেষকরাও। তারা বলছেন, শিক্ষা ক্ষেত্রকে রাজনৈতিক সফলতা দেখানোর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করাতেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা পিছিয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমান খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। যা অনেক সময় শিক্ষা বান্ধব হয়েছে কখনো রাজনীতি বান্ধব। রাজনৈতিক ইচ্ছায় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ করার প্রবণতা আমরা দেখেছি যা শিক্ষার্থীদের নিজেদের যোগ্যতায় ভালো ফল করার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করেছে।”

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, এতোদিন যে ফলাফল দেখানো হয়েছে সেটি ছিল রাজনৈতিক। “এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র অনেকাংশে তুলে ধরেছে বলেই মনে করেন মি. খান।

শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ। তিনি বলছেন, “শিক্ষা ব্যবস্থায় গলদ আছে কি না আছে সেটি রিসার্চের বিষয়। আমরা এক কথা বলে দেই কিন্তু এভিডেন্স বেজড নয়, এটা তো সমস্যা।”

শিক্ষার পলিসিগত পরিবর্তনের কথাও বলছেন তিনি। “শুধু রেজাল্টই যথেষ্ট নয়, শিক্ষার্থীদের যা শেখা প্রয়োজন সেটি তারা শিখছে কিনা, যে অ্যাটিটিউড তাদের ডেভেলপ করার কথা সেটি হচ্ছে কিনা এগুলো দেখতে হবে।” কেবল পাস করে সার্টিফিকেট অর্জনের এই শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার কথাও বলেন মি. রশিদ।