আমনের ফলন লক্ষ্যের চেয়ে ২৮ লাখ টন কম হওয়ার আশঙ্কাঃ ইউএসডি

206

নিউজ ডেস্কঃ দেশে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ টনের বেশি। চলতি অর্থবছরে ১ কোটি ৭৮ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)।

আর খাদ্য দেশে গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের আমন মৌসুমে ধানের ফলন হয়েছিল ১ কোটি ৬৬ লাখ টনের বেশি। চলতি অর্থবছরে ১ কোটি ৭৮ লাখ টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) হিসাবে ফলনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ টন। তবে সাম্প্রতিক দুটি বন্যা এবার আমনের উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে। তাই ধানের ফলন গতবারের তুলনায় কমে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছে মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)। সে অনুযায়ী এফপিএমইউর লক্ষ্যের তুলনায় এবার ২৮ লাখ টন কম ফলন হতে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বন্যার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি আমনের আবাদ। আবার অনেক এলাকায় দেরিতে আবাদ করায় উৎপাদন কম হয়েছে। সামগ্রিক ফলন এবার ১ কোটি ৫০ লাখ টনে পৌঁছার সম্ভাবনা তেমন একটা নেই। যদিও সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, ইউএসডিএ যেভাবে আশঙ্কা করছে, উৎপাদন ততটা নাও কমতে পারে।

ইউএসডিএর গত শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যায় আমনের প্রায় দুই লাখ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। আবার অক্টোবরের শুরুর দিকে শেরপুর ও ময়মনসিংহের আকস্মিক বন্যায় প্রায় এক লাখ হেক্টর আমনের ফসলি জমি ক্ষতির শিকার হয়। সব মিলিয়ে এবার আবাদি এলাকা কমেছে প্রায় আড়াই লাখ হেক্টর। এর ধারাবাহিকতায় আমনের উৎপাদন গতবারের চেয়ে কমে নেমে আসতে পারে ১ কোটি ৪০ লাখ টনে।

দক্ষিণাঞ্চলের বন্যার পানি সরতে দেরি হওয়ায় পুনরায় ধান আবাদ করা সম্ভব হয়নি, যার প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক উৎপাদনেও। অন্যদিকে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার প্রভাব পড়লেও পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় সেখানে ফলনে তেমন ক্ষতি হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুসলিমা খানম নীলুর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে আমনের আবাদ কিছু মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটিতে একটু বেশি ক্ষতি হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে এখানে ফলন হ্রাসের হার তুলনামূলক কম। উপজেলাটিতে ফলন কমার হার কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হবে না বলে মনে করছে স্থানীয় কৃষি দপ্তর।

বন্যার কারণে এবার মূলত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোয়ই আবাদ ও ফলন কমেছে সবচেয়ে বেশি, যার অন্যতম উদাহরণ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা। স্থানীয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খান পাপ্পুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলাটিতে এবার ৭ হাজার ৬৪ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। কিন্তু বন্যায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় অনেক জমি আবাদের আওতায় আনা যায়নি। উপজেলায় এবার আমন ধান চাষ হয় ৫ হাজার ৪৬ হেক্টরে। সে অনুযায়ী, লক্ষ্যের তুলনায় প্রায় ২৯ শতাংশ জমিতে ধান লাগানো যায়নি এবার।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী আমনের ফলন না হওয়া এবং উৎপাদন খরচ বাড়ায় এবার চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারকে বেগ পোহাতে হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের পরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এবার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। মূলত ফলন বেশি ভালো না হওয়ায় ধানের ভরা মৌসুমেও চালের দাম কমছে না। কারণ সরকার চাল সংগ্রহ করায় বাজারে সরবরাহ তেমন বাড়েনি। আবার ব্যবসায়ীরাও মজুদ করছে। তাছাড়া উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় সরকার ৪৭ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহ করছে। তাই মোটা চাল এবার ৫০ টাকার নিচে নামবে না।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্টরা যদিও বলছেন, এবার ধানের ফলন পর্যাপ্ত হয়েছে। ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানও জোরেশোরে চলছে। তাতে কৃষকদের সাড়াও মিলছে। সে অনুযায়ী চালের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কথা না। তার পরও তা যদি হয়ে থাকে, তবে তা কৃত্রিমভাবে করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাসুদুল হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ধান সংগ্রহের সময় আরো আড়াই মাস বাকি। যদিও এরই মধ্যে লক্ষ্যের ৩২ শতাংশ সংগ্রহ হয়ে গেছে। আমদানিও চলমান রয়েছে। তার পরও চালের দাম বাড়ার বিষয়টি নিয়ে আমাদের সন্দেহ হচ্ছে। হয়তো বাজারে পণ্যটির দাম কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হচ্ছে। আমরা জেলা প্রশাসকদের মাঠ পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে বলেছি।’

আমন মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম এবার বেশ জোরালো হয়ে উঠেছে। এতে প্রতি কেজি ধানের মূল্য ধরা হয়েছে ৩৩ টাকা। আর আতপ চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে ৪৭ টাকা কেজি দরে।

ডিএইর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার প্রভাবে এবার আমনের উৎপাদন কিছুটা কমলেও ইউএসডিএ যেভাবে আশঙ্কা করছে, সে মাত্রায় কমেনি। উপরন্তু এবার ফলন ভালো হয়েছে। আর যেটুকু কমেছে তা আসন্ন বোরো মৌসুমে পুষিয়ে দেয়া সম্ভব।

সংস্থাটির মহাপরিচালক মো. ছাইফুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বন্যায় কিছু এলাকায় ফলন ব্যাহত হয়েছে। আমরা পুনরায় আবাদের চেষ্টা করলেও তা পুরোপুরি করা যায়নি। এতে ফলন কিছুটা কম হলেও ১ কোটি ৪০ লাখ টনে নামবে না। এবার কিন্তু ফলন ভালো হয়েছে। আর ঘাটতি যা হয়েছে, তা আমরা রবি মৌসুমে বোরো আবাদের মাধ্যমে পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি।’

বন্যাপ্রবণ এলাকায় নতুন করে বীজ সরবরাহ করে উৎপাদন ঠিক রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানান কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান। সার্বিক বিষয়ে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চেষ্টার পরও কিছু এলাকায় পুনরায় আবাদ করা যায়নি। বন্যার প্রভাব বাদ দিয়ে বাকি এলাকায় আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ীই ফলন হয়েছে। তবে উৎপাদনের সম্পূর্ণ হিসাব এখনো তৈরি করা হয়নি। এটি চলমান রয়েছে।’