সারাদেশে এটিএম বুথে নগদ টাকার সংকট, অনেক ব্যাংকের এটিএম সেবা বন্ধ বিপাকে গ্রাহক

186

নিউজ ডেস্কঃ দেশের ব্যাংকে ব্যাংকে নগদ টাকার সংকট সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের পর সারা দেশে নিরাপত্তার অভাবে বেশির ভাগ ব্যাংকের এটিএম বুথ বন্ধ রয়েছে। কিছু ব্যাংকের বুথ খোলা থাকলেও তাতে কোনো নেই টাকা। পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যাংকগুলোর সব শাখা এখনো খুলেনি। এর ফলে সাধারণ মানুষ ব্যাংকের টাকা তুলতে পারছেন না। আর এতেই নগদ টাকার তীব্র সংকটে পড়েছেন মানুষ।

ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের বেশির ভাগ এটিএমে অর্থ সরবরাহের কাজটি করা হয় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তৃতীয় পক্ষের এ সেবা বন্ধ রয়েছে। এ কারণে বেশির ভাগ এটিএমে টাকার সংকট দেখা দিয়েছে। তাই বন্ধ হয়ে গেছে দেশ জুড়ে বেশির ভাগ ব্যাংকের এটিএম সেবা।

গত কয়েক দিন ধরে মতিঝিল, দিলকুশা ও পল্টন কাওরানবাজার এলাকার একাধিক এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে পারেননি সাধারণ মানুষ। দেশের সব জেলাতেই একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বুথে টাকা না থাকায় এমন সংকট তৈরি হয়েছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, যতটা না টাকার সংকট তার চেয়ে বেশি নিরাপত্তার শঙ্কায় ব্যাংকগুলো তাদের এটিএম কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে।

চলমান পরিস্থিতিতে টাকা পরিবহনের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না অনেক ব্যাংক ও এটিএমে অর্থ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান। আবার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা পাওয়া যাচ্ছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাস শেষে দেশে বিভিন্ন ব্যাংকের মোট এটিএমের সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৪২৮। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে ৯ হাজার ৪০৯টি আর গ্রামাঞ্চলে ৪ হাজার ১৯টি। এটিএম ছাড়া সিআরএমের (ক্যাশ রিস্লাইকিং মেশিন) মাধ্যমেও নগদ টাকা উত্তোলন করা যায়।

জানা যায়, দেশের বেসরকারি খাতের অনেক ব্যাংক এখন এটিএমের বদলে সিআরএমের প্রতি ঝুঁকছে। সিআরএমে টাকার উত্তোলনের পাশাপাশি নগদ জমারও সুযোগ রয়েছে। এ কারণে ধীরে ধীরে সিআরএমের সংখ্যা বাড়ছে। গত মে মাস শেষে দেশে সিআরএমের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৫০। এসব সিআরএমের সিংহভাগই শহরাঞ্চলে, যা ৩ হাজার ৯৮৫টি। বন্ধ থাকা বেশির ভাগ ব্যাংকের বুথের নিরাপত্তাকর্মীদেরও পাওয়া যায়নি। যাদের পাওয়া গেছে তারা জানিয়েছেন, নিরাপত্তার অভাবে

বুথগুলোতে টাকা সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি। এদিকে, দেশের ব্যাংক খাতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্তত তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয়ও হট্টগোল হচ্ছে। গভর্নরসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতিতে খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকেও শৃঙ্খলা ফেরেনি। শুক্রবার গভর্নর পদত্যাগ করেছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অভিভাবকশূন্য হয়ে যাওয়ার কারণেই ব্যাংক খাতে এতটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকসহ (ইউসিবি) বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে বৃহস্পতিবারও বিশৃঙ্খলা হয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহাম্মদ মুনিরুল মওলাকে দাপ্তরিক কাজ করতে দেওয়া হয়নি। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের দুই জন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের পিটুনিতে ব্যাংকটির মাসুদ মিয়া নামের এক জন কর্মকর্তা গুরুতর আহতও হয়েছেন। আর বিক্ষোভ ও মানববন্ধন হয়েছে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের সামনে। ন্যাশনাল ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকসহ আরো কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন কিংবা নতুন পরিচালক অন্তর্ভুক্তির দাবি উঠেছে।

 

প্রভাবশালীরা ব্যাংক থেকে টাকা তুললেই জানাতে হবে

 

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের নির্দেশনা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ব্যাংক থেকে যে কোনো পরিমাণ টাকা তুললেই জানানোর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অপরাধমূলক কাজ সংঘটন ঠেকাতে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সব ব্যাংকের প্রধান মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্মকর্তাকে ডেকে নিয়ে এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। গেল সপ্তাহে সব ব্যাংকের প্রতিনিধিদের নিয়ে ঐ বৈঠক হয়েছে।

জানা গেছে, বিগত সরকারের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা বা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এমন ব্যক্তিদের অনেকেই সশরীরে উপস্থিত না হয়ে অন্যদের মাধ্যমে চেক নগদায়নের জন্য ব্যাংকে পাঠাচ্ছেন। কেউ কেউ টাকা তুলতে চেষ্টা করছেন। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংক থেকে ফোন করে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকে দিকনির্দেশনা চাওয়া হচ্ছে। এরকম অবস্থায় সন্দেহজনক হলে চেক ফেরত দিতে বলা হয়। এসব বিষয়ে সামগ্রিকভাবে একটি নির্দেশনা দিতে ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে বিএফআইইউ।

ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, এরই মধ্যে তারা নগদ টাকা উত্তোলন তদারকি করছেন। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে তারা লেনদেনের ক্ষেত্রে নানা নিয়ন্ত্রণ এনেছেন। এর অন্যতম কারণ, এটিএম বুথে টাকা ঢোকাতে রাজি হচ্ছে না সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো। আবার এক শাখা থেকে আরেক শাখায় টাকা নিতে চাচ্ছে না। এ অবস্থায় গ্রাহকরা সব এটিএম বুথে টাকা পাচ্ছেন না। আবার যেসব বুথে টাকা আছে, সেখানে লেনদেন সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাসাবাড়ির নিরাপত্তা বিবেচনায় অনেকেই শাখায় টাকা জমা দিচ্ছেন। অনেকেই বড় অঙ্কের টাকা দেওয়ার জন্য টেলিফোন করে জানতে চাচ্ছেন। অচিরেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে তারা আশা করছেন।

বৈঠকে বলা হয়, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে অনেক প্রতিষ্ঠান বেনামি ঋণ নিয়েছে। এই মুহূর্তে বেনামি কোনো ঋণের টাকা ছাড় করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে মঙ্গল ও বুধবার ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম গ্রুপের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট দুটি প্রতিষ্ঠানের ৮৪৮ কোটি টাকার বেনামি ঋণ বের করে নেওয়ার চেষ্টার বিষয়টি আলোচনায় আসে। যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো ঋণের অর্থ যেন ছাড় না করা হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে প্রতিটি ব্যাংকের বেনামি ঋণের আসল সুবিধাভোগীর তথ্য জানাতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নির্দেশনা দিয়েছে, এ সময়ে নগদ টাকা নিয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে খাটাতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভেঙে ভেঙে একাধিক শাখা থেকে টাকা তুললে তা বোঝার উপায় থাকবে না। এ কারণে টাকা উত্তোলনের সঙ্গে সন্দেহজনক প্রবণতার বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয়ভাবে তদারকি করতে হবে।