ঢাকায় স্রোতের মতো আসছে মানুষ প্রতিদিন

17

ঢাকায় প্রতিদিনই মানুষ আসছে। অনেকটা স্রোতের মতো রাজধানীমুখী হচ্ছে মানুষ। মানুষ আর মানুষ। মানুষের ভারে ন্যুব্জ রাজধানী ঢাকা। জনসংখ্যার বিস্ফোরণে চাপ পড়ছে আবাসন, পরিবহন, চিকিৎসা, শিক্ষা, পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। হাঁটার জায়গা নেই, স্বস্তিতে শ্বাস নেয়ার সুযোগ নেই। যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ আর আবাসন সংকট নিত্যসঙ্গী। দেশের রাজধানী শহরে আসলে কতো মানুষের বাস তার সঠিক কোনো তথ্য নেই কারও কাছে। 

Image description

 

এই পরিসংখ্যানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ঢাকার জনসংখ্যা শুধু প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জাতিসংঘের ২০২৫ সালের নতুন নগরায়ণ পদ্ধতিতে শহরের ধারাবাহিকভাবে বিস্তৃত বৃহত্তর নগরাঞ্চলকে হিসাবের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে ঢাকার নগর সমষ্টির জনসংখ্যা সিটি করপোরেশনের জনসংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। একই কারণে ঢাকা বিভাগের ৪ কোটি ৪২ লাখ মানুষের হিসাবও ৩ কোটি ৬৬ লাখের ঢাকা নগর সমষ্টির হিসাবের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩০ হাজার ৪৭৪ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রায় ৩৯ হাজার ৩৫৩ জন মানুষ বাস করেন। অর্থাৎ দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন ও জনসংখ্যা একসঙ্গে ধরলে ঢাকার গড় জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩৩ হাজার ৬০০ জন। সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা লালবাগ, বংশাল, গেন্ডারিয়া ও সবুজবাগ এলাকায় প্রতি একরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ জন মানুষ বাস করে। ঢাকার কিছু বস্তিতে প্রতি বর্গ কিলোমিটারে ২ লাখ ২০ হাজার মানুষ বাস করেন।

 

শহরমুখী হওয়ার এই প্রবণতা উঠে এসেছে বিবিএস ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) এক গবেষণাতেও। এতে দেখা যায়, ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় (মেগাসিটি) প্রতিদিন নতুন ১ হাজার ৭০০ মানুষ যুক্ত হয়। ২০১৪ সালে রাজধানীর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগে ভর্তি হওয়া দুই সেশনের শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই দুই সেশনে ভর্তি হয়েছিলেন ২৪ ও ২৮ জন শিক্ষার্থী। যাদের ২০১৮ সালে অনার্স শেষ হয়। এই ৫২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪৭ জনই ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকার থেকে এসেছেন। ৫২ জনের মধ্যে দেশের বাইরে গিয়েছেন ১২ জন। নিজ এলাকায় ফিরে গেছেন ৭ জন। আর ২ জন অন্য শহরে চাকরি করছেন। বাকিরা থাকছেন ঢাকায়।

 

 

 

‘মেগাসিটি পপুলেশন গ্রোথ ও আরবান প্ল্যানিং’ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় গবেষণারত আতিউর রহমান সৃজন বলেন, ঢাকার সমস্যা এখন শুধু পপুলেশন গ্রোথ নয়; এটি আরবান ক্যারিং ক্যাপাসিটি ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ক্যাপাসিটির মধ্যে বড় ধরনের মিসম্যাচ। যে হারে পপুলেশন বাড়ছে, সে হারে হাউজিং, মোবিলিটি, ওয়াটার, স্যানিটেশন, ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট ও পাবলিক স্পেস তৈরি হচ্ছে না। ফলে হাই-ডেনসিটি মেগাসিটি হিসেবে কনজেশন, পলিউশন, হিট স্ট্রেস ও কোয়ালিটি অব লাইফের ওপর চাপ বাড়ছে।

তিনি বলেন, ঢাকাকে শুধু এক্সপ্যান্ড করে এই সমস্যার সমাধান হবে না; প্রয়োজন পলিসেন্ট্রিক আরবান ডেভেলপমেন্ট। ঢাকার বাইরে রিজিওনাল ইকোনমিক হাব তৈরি করে এমপ্লয়মেন্ট, এডুকেশন ও হেলথকেয়ার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। একইসঙ্গে ল্যান্ড-ইউজ প্ল্যানিং, মাস ট্রানজিট, অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং ও ইকোলজিক্যাল জোনকে ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্কে আনতে হবে। কারণ ঢাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পকেন্দ্রিক দুর্যোগ হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তাই এখনই ঢাকাকে কিছুটা রেস্ট দিয়ে গার্মেন্টসহ বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে ঢাকার বাইরে নেয়ার পরিকল্পনা জরুরি।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কৃষি রসায়ন বিভাগের প্রফেসর ড. মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আমাদের নির্দিষ্ট পরিমাণ কৃষি জমির ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের আয়তন অপরিবর্তিত থাকলেও সীমিত জমিতে অধিক ফসল ফলাতে হচ্ছে। আর ঢাকার চারপাশের কৃষি জমিতে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। যেখানে আগে বছরে এক বা দু’টি ফসল হতো, সেখানে এখন একই জমিতে তিনটি থেকে চারটি পর্যন্ত ফসল বা স্বল্পমেয়াদি সবজি চাষের চেষ্টা করা হচ্ছে। ​অধিক ফলন পাওয়ার এই দৌড়ে কৃষি জমিতে মাত্রারিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে প্রকৃতির স্বাভাবিক ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র যেমন ধ্বংস হচ্ছে, তেমনই একইসঙ্গে ব্যাপকভাবে পানি দূষণ ঘটছে। পাশাপাশি, খাদ্যের চাহিদা মেটাতে পতিত জমি ও বন-জঙ্গল কেটে চাষযোগ্য করায় আমাদের মোট বনভূমির পরিমাণ কমে ১০ শতাংশেরও নিচে নেমে এসেছে, যা পরিবেশের ভারসাম্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শাম্মী আক্তার সেতু বলেন, ঢাকায় মানুষ বাড়ার অন্যতম কারণ হলো আবাসন, চাকরি, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়া। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পলিসি পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ঢাকায় অতিরিক্ত চাপ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসার একপর্যায়ে রোগীদের ঢাকায় রেফার করা হয়। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, হাসপাতাল ও প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক সুবিধা জেলা পর্যায়ে নিশ্চিত করা গেলে এ চাপ কমানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি জেলায় কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো গেলে কাজের জন্য যেসব মানুষ ঢাকায় এসে ইনফর্মাল সেক্টরে যুক্ত হচ্ছেন, তাদের একটি অংশ নিজ এলাকাতেই কাজের সুযোগ পেতে পারেন। তাই ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।

নগরপরিকল্পনা স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ভবিষ্যৎ ভয়ঙ্কর। হকার, অবৈধ ব্যাটারিচালিত যান, ছিনতাই বেড়ে যাওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ— এসবের পেছনে মূল কারণ ঢাকাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাণিজ্য ও বিনোদনের এককেন্দ্রিক শহরে পরিণত করা। সারা দেশের সুষম উন্নয়নকে উপেক্ষা করে সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক করায় শহরের ওপর জনসংখ্যার চাপ বেড়েছে। একইসঙ্গে ঢাকার চারপাশের খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ দখল ও ধ্বংস করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম অবাসযোগ্য শহর হওয়ার পরও আমরা পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে পারিনি।

তিনি বলেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। সহজ যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে তাদের নিজস্ব সম্পদ কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির সক্ষমতা দিতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো সরকারই নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোর প্রতিশ্রুতির বাইরে এ কাজ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি। ফলে জনস্বাস্থ্য, গণপরিবহন, যানজট ও জলজটের সংকট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে জলাধার ও জলপ্রবাহের পথ ধ্বংসের কারণে ভবিষ্যতে ঢাকা আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়তে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরির কারখানা হিসেবে এই ঢাকাকে ঘোষণা করতে হবে।