আমানত ফেরত নিয়ে অনিশ্চয়তা
নভেম্বর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে ডিসেম্বরের শেষ দিকে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলা হলেও এখনো সেই স্কিম প্রস্তুত হয়নি।
বিপুল আমানত, সীমিত মূলধন
একীভূত পাঁচ ব্যাংকের মোট আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। এসব আমানতকারীর মোট জমার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে, নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নির্ধারিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
শাখাগুলোতে গ্রাহকশূন্যতা
অধুনালুপ্ত পাঁচ ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিনই বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা। ন্যূনতম যে আস্থা তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে।
খেলাপি ঋণের পাহাড়
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক জন্মসূত্রেই পেয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা খেলাপি ঋণের বোঝা— যা মোট ঋণের প্রায় ৮৩ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট বিতরণকৃত ঋণ ১ লাখ ৯৭ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা এবং প্রভিশন ঘাটতি ১ লাখ ২১ হাজার ৬৪১ কোটি টাকা।
পৃথক ব্যাংকভিত্তিক চিত্র
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা; যা মোট ঋণের ৯৬ শতাংশ। ব্যাংকটির মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ২১ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা।
ফার্স্ট সিকিউরটি ইসলামী ব্যাংক
ফার্স্ট সিকিউরটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৯ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৬ শতাংশ। ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৬২ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৫২ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বয়স সবেমাত্র এক দশক অতিক্রম করলেও খেলাপিতে পুরাতন ব্যাংকগুলোর সমান, ৯৬ শতাংশ। খেলাপি টাকার অংকে ১৪ হাজার ১৪ কোটি টাকা। আর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৪ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা।
ইউনিয়ন ব্যাংক
পরে জন্ম নিয়ে শীর্ষ খেলাপি হয়েছে ইউনিয়ন ব্যাংক। এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৭ হাজার ১১৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯৭ শতাংশ। আর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। ব্যাংকটির প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ ১৫ হাজার ২৫২৭ কোটি টাকা।
এক্সিম ব্যাংক
একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংকের অবস্থা এখনো ভালো। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৭ শতাংশ। আর মোট বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৫৪ হাজার ১৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের হার কম, পক্ষান্তরে জীবন্ত ঋণের হার বেশি, ৪৩ শতাংশ।
১৬ হাজার কর্মীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ
এই পাঁচ ব্যাংকে কর্মরত প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী দেড় বছর ধরে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। অনেকের নিয়মিত বেতন বন্ধ, প্রভিডেন্ট ফান্ডের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। জানা গেছে, বেতন ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো কিংবা কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কাও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক একটি সক্ষম প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, নাকি একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে— তা এখনো অনিশ্চিত। খেলাপি ঋণ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হলেও বাস্তবে এমন কোনো কার্যকর কাঠামো এখনো নেই।”
তিনি আরও বলেন, “দুই লাখ টাকার নিচে আমানত দেওয়া শুরু হলে অধিকাংশ গ্রাহক টাকা তুলে নেবে। তখন তারল্য চাপ আরও বাড়বে।”
অর্থনীতিবিদ তৌফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন, “সরকারি মালিকানা মানেই আস্থা— এই ধারণা ভুল। মূলধন ঘাটতি, খেলাপি ঋণ ও দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে আস্থা ফিরবে না।”
আস্থার ভবিষ্যৎ কোন পথে?
সরকারের প্রত্যাশা, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হবে দেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামী ব্যাংক এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে বাস্তবে প্রতিদিন হাজার হাজার আমানতকারী শাখায় এসে হতাশ হয়ে ফিরছেন।
আস্থা ফিরবে নাকি আস্থাহীনতা আরও গভীর হবে— তা নির্ভর করছে দ্রুত সিদ্ধান্ত, বাস্তবমুখী সংস্কার ও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপের ওপর। নইলে ঘর পোড়া গরুর মতো আমানতকারীরা সিঁদুরে মেঘ দেখলেই আবার আগুন খুঁজবে— এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।



