হিমেল বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত : উত্তর-দক্ষিণে তীব্র শীত, দিনের ‘সর্বোচ্চ’ তাপমাত্রাও ১৪ ডিগ্রি! হিম বাতাস আর দীর্ঘসময় ঘন কুয়াশায় নিস্তেজ সূর্য :: দিন-রাতের তাপমাত্রা কাছাকাছি হওয়ায় অসহনীয় শীতকষ্ট :: উৎপাদশীলতা হ্রাসে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশ।
ঢাকাঃ সারাদেশে তীব্র শীতের ঝাঁজে ঠাণ্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছে মানুষ! কাঁপছে প্রাণিকুল। কেন এবার এতোটা শীতের দাপট? এই প্রশ্নে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে হিমালয় পর্বতমালা ছুঁয়ে ঘণ্টায় ১২ কি.মি. বেগে আসছে হিমেল বাতাস। সেই সঙ্গে দিনের বেলায়ও দীর্ঘসময় যাবত ঘন কুয়াশায় আলো-আঁধারি অব্যাহত রয়েছে। সূর্যের প্রায় দেখা নেই। মাটিতে পড়ার আগেই রোদ বা সূর্যালোক নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। বাতাসের আর্দ্রতা তথা জলীয়বাষ্পের পরিমাণও অত্যধিক বেশিই (গতকাল সোমবার ঢাকায় সকালে ৮৫, সন্ধ্যায় ৭৭ শতাংশ) রয়েছে।
এ অবস্থায় দিনের ‘সর্বোচ্চ’ তাপমাত্রা ১৪ থেকে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে অবস্থান করছে দেশের বেশিরভাগ জেলাতেই। তাছাড়া ঊর্ধ্বকাশ থেকে অনবরত নিচের দিকে জোরালো বেগে নেমে আসছে শীতল ‘জেটবায়ু’। দিন ও রাতের তাপমাত্রা খুবই কাছাকাছি এসে গেছে। এর ফলে অসহনীয় হয়ে উঠেছে শীতকষ্ট। এই চারটি কারণেই তীব্রতর হয়ে উঠেছে শীতের অনুভূতি।
আবহাওয়া বিভাগ জানায়, রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ‘স্বাভাবিক’ পর্যায়েই রয়েছে। গতকাল সোমবার দেশের সর্বনিম্ন (অর্থাৎ রাতের সর্বনিম্ন) তাপমাত্রা ছিল পাবনার ঈশ^রদীতে ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সে.। যা পৌষ-মাঘের মৌসুমে অর্থাৎ বছরের শীতলতম জানুয়ারি মাসের ক্ষেত্রে রাতের ‘স্বাভাবিক’ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বলছেন আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা। তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সে. পর্যন্ত মৃদু শৈত্যপ্রবাহ হিসাবে ধরা হয়। গতকাল সমগ্র রাজশাহী বিভাগজুড়ে এবং দিনাজপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া জেলার ওপর দয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায় এবং অব্যাহত থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
অন্যদিকে ঝিরঝির বৃষ্টির মতো অবিরাম ঘন কুয়াশাপাত ও ঠা-া বাতাসের জোরে দিনের ‘সর্বোচ্চ’ তাপমাত্রাও বেশ কয়েকদিন যাবত অস্বাভাবিক নিচে নেমে গেছে। গতকাল সিরাজগঞ্জের তাড়াশে দিনের ‘সর্বোচ্চ’ তাপমাত্রা ছিল ১৪ এবং যেখানে রাতের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সে.। নওগাঁ জেলার বদলগাছীতে দিনে ‘সর্বোচ্চ’ ছিল ১৪ এবং রাতের সর্বনিম্নœ ১০.৭ ডিগ্রি সে.। রাজধানী ঢাকায় গতকালের তাপমাত্রা দিনে ‘সর্বোচ্চ’ ছিল ১৮.৮ এবং রাতের সর্বনিম্নœ ১৩.২ ডিগ্রি সে.। চট্টগ্রামে যথাক্রমে ১৯.১ এবং ১৩.৭ ডিগ্রি সে.।
তাছাড়া গতকাল দিনের ‘সর্বোচ্চ’ তাপমাত্রা অস্বভাবিক পর্যায়ে নিচে অবস্থানকারী আবহাওয়া স্টেশনগুলোর মধ্যে আরও রয়েছেÑ আরিচায় ১৪.২, বগুড়ায় ১৪.৫, ফরিদপুরে ১৪.৬, বাঘাবাড়ী ১৪.৫, দিনাজপুর ও রাজশাহী ১৪.৮, চুয়াডাঙ্গায় ১৫ ডিগ্রি সে.। এসব এলাকায় দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে গিয়ে শীতের তীব্রতা প্রকট এবং জনজীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

এদিকে পৌষের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকেই প্রায় সারা দেশে হাঁড় কনকনে হিমেল হাওয়ার সাথে মাঝারি কিংবা ঘন কুয়াশা এবং ঠা-ার কামড়ে শীতজনিত জ্বর-সর্দি কাশি, ডায়রিয়া, শ^াসকষ্ট, শিশুদের নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে ঘরে ঘরে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতাল-ক্লিনিক, ডাক্তারখানায় বেড়ে গেছে রোগীর চাপ।
অবিরাম ঘন কুয়াশা এবং তীব্র ঠা-া আবহাওয়ায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি-খামারসহ অনেক সেক্টরে সার্বিকভাবে মানুষের উৎপাদশীলতা এবং সক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। যার বিরূপ প্রভাব-প্রতিক্রিয়া পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর। চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকগণ। হাঁড়কাঁপানো শীত ও ঘন কুয়াশায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে দিনে এনে দিনে খাওয়া শ্রমজীবী নিম্নআয়ের মানুষ। শীতবস্ত্র নেই অনেকেরই; খড়কুটো পুড়িয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। তাদের রুজি-রোজগারে ভাটা পড়েছে।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়া পূর্বাভাসে আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, অস্থায়ীভাবে আংশিক মেঘলা আকাশসহ সারা দেশের আবহাওয়া শুষ্ক থাকতে পারে। মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে। তবে কোথাও কোথাও কুয়াশা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন এবং সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িক ব্যাহত হতে পারে। বর্তমানে দিনাজপুর, যশোর, চুয়াডাঙ্গা এবং কুষ্টিয়া জেলাসহ পুরো রাজশাহী বিভাগের ওপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা অব্যাহত থাকতে পারে। সারা দেশে রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে। দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে সারা দেশে শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়া বিভাগ আরো জানায়, উপ-মহাদেশীয় উচ্চচাপ বলয়ের বর্ধিতাংশ পশ্চিমবঙ্গ এবং এর সংলগ্ন বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থান করছে। মৌসুমের স্বাভাবিক লঘুচাপ দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। এর একটি বর্ধিতাংশ উত্তরপূর্ব বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত আছে।

এদিকে চলতি জানুয়ারি মাসের (পৌষ-মাঘ) দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে আবহাওয়া বিভাগের বিশেষজ্ঞ কমিটি জানায়, এ মাসে সারা দেশে ৪ থেকে ৫টি মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে বর্তমানে একটি বয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া এ মাসে দেশের বেশ কিছু জেলায় তীব্র ধরনের শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাপমাত্রার পারদ নামতে পারে ৬ ডিগ্রি সে. পর্যন্ত।
বরিশাল ব্যুরো জানায়, হিম শীতল ঠান্ডা ও কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বরিশালের জনজীবন। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকলেও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৫ ডিগ্রি কমে গেছে। গতকাল সোমবার ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটার বেগে বইতে থাকা হিমেল বাতাসে অতি জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হতে পারেননি। আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, দক্ষিণ বঙ্গোপসাগরে মৌসুমি লঘুচাপ অবস্থান করলেও এর বর্ধিতাংশ বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে সক্রিয় রয়েছে। ফলে মধ্যরাতের পর থেকে সকাল পর্যন্ত ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। এতে সড়ক, নৌ ও আকাশপথে যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে।
কনকনে ঠান্ডার কারণে কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কৃষক ও কৃষিশ্রমিকরা অনেক বেলা পর্যন্ত মাঠে নামতে পারছেন না। জেলেরা নদ-নদীতে মাছ ধরতে না পারায় বাজারে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দক্ষিণাঞ্চলের সরকারি হাসপাতালগুলোতে মধ্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের শেষ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি নারী, পুরুষ ও শিশু ভর্তি হয়েছেন। নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি ও জ্বরের প্রকোপ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল বরিশালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ২০.২ ডিগ্রি। আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, এই অবস্থা আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে।

স্টাফ রিপোর্টার, গাইবান্ধা থেকে জানান, গাইবান্ধা জেলায় ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। শীতের প্রকোপে কৃষি ও নৌ-পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। কৃষকরা মাঠে ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না। বোরো ধানের বীজতলা ও অন্যান্য রবি ফসলের পরিচর্যা বিঘিœত হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক জানান, চলতি মৌসুমে জেলা জুড়ে ৬ হাজার ৬শ ৯৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান ও ৩৬ হাজার ৯৫১ হেক্টর জমিতে রবি ফসল চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ঘন কুয়াশা ও তীব্র শীতের কারণে বীজতলার কিছু অংশ হলুদ হয়ে যেতে পারে। কৃষকদের আগাম সতর্কতা এবং সঠিক পরিচর্যার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। শীতের প্রভাবে সাধারণ মানুষও বিপর্যস্ত। দিনমজুর, জেলে ও কৃষিশ্রমিকরা কাজ করতে পারছে না। ফলে পরিবারের দৈনন্দিন জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা জানান, শীতের কারণে বাজারে সবজির চাহিদা কমে গেছে, দাম নেমে গেছে, ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা সতর্ক করেছেন, ঠান্ডার কারণে নিউমোনিয়া, সর্দি-কাশি এবং জ্বরের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, গাইবান্ধার মানুষের জীবনযাত্রা তীব্র শীত ও ঘন কুয়াশার কারণে অনেকটাই বিপর্যস্ত।
কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা জানান, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে শীত আর মৌসুমি দুর্ভোগ নয় এটি রূপ নিয়েছে ভয়াবহ মানবিক সংকটে। ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন। সবচেয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ মানুষ। রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার জানায়, গতকাল জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৩.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৮৯ শতাংশ। এর ফলে দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও জেলেদের কাজ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জেলায় ছড়িয়ে থাকা ৪৬৯টি চরে বসবাসরত মানুষের জন্য শীতবস্ত্রের সরবরাহ অত্যন্ত অপ্রতুল। যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর জানান, প্রায় ৩৬ হাজার মানুষের বিপরীতে তিনি পেয়েছেন মাত্র ১০০টি কম্বল। কোনো কোনো ওয়ার্ডে তিন হাজার মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র চারটি কম্বল।
শীতজনিত রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। তবে চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার চরম সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, অনেক কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত চিকিৎসক পাওয়া যায় না। কৃষি বিভাগ জানায়, শীতের কারণে ৫৪ হেক্টর বোরো ধানের বীজতলা এবং এক হেক্টর আলুর বীজতলা কোল্ড ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। যদিও শীতকালীন সবজির বড় ক্ষতি হয়নি। ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ জানায়, জেলায় এখন পর্যন্ত ২৭ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম।
পাবনা জেলা সংবাদদাতা জানান, উত্তরাঞ্চলের নদীবেষ্টিত পাবনা জেলায় টানা শৈত্যপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুই সপ্তাহ ধরে সূর্যের লুকোচুরিতে দিনভর বইছে কনকনে ঠান্ডা বাতাস। ঘন কুয়াশায় সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচল অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। ঈশ্বরদী আবহাওয়া অফিস জানায়, সোমবার জেলার সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৮.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন। এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমেছে প্রায় ১.৬ ডিগ্রি। শৈত্যপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও খেটে খাওয়া মানুষ। অনেকেই খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শীতের প্রভাবে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ৪২ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত ১২৬ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সতর্ক করে জানিয়েছে, শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কৃষকদের আগাম সতর্কতা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা সংবাদদাতা জানান, হাড় কাঁপানো শীতে সিরাজগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। শীতের প্রকোপে বীজতলাসহ সবজি ও ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের। মাঠে কাজ ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাড়াশ উপজেলার প্রান্তিক কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, কনকনে ঠান্ডা ও ঘন কুয়াশায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে বপন করতে হলে খরচ দ্বিগুণ হবে। একই এলাকার সবজি চাষি নুরুল ইসলাম বলেন, ঠান্ডার কারণে বাজারে সবজির চাহিদা কমে গেছে। ফলে দাম নেমে গেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। শীতজনিত রোগেও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেক কৃষক ও শ্রমিক। শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের হাসপাতালে নেওয়ার সংখ্যাও বেড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানায়, জেলায় মোট কৃষিজমির পরিমাণ ১ লাখ ৮৫ হাজার ১৭৭ হেক্টর। শীতে কৃষি কার্যক্রম ব্যাহত হলেও বীজতলার বড় ক্ষতি এখনো হয়নি। তবে পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
দিরাই (সুনামগঞ্জ) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, দিরাই উপজেলায় টানা তীব্র শীতে জনজীবন এবং কৃষি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় কৃষকরা মাঠে নামতে পারছেন না। বোরো ধানের বীজতলা রক্ষায় যথাযথ পরিচর্যা করা যাচ্ছে না। উপজেলার বিভিন্ন হাওরের কৃষি জমিতে শীতজনিত সমস্যার কারণে ফসলের পরিচর্যায় বিলম্ব দেখা দিয়েছে। শিশু ও বৃদ্ধরা শীতজনিত অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে। সর্দি, কাশির পাশাপাশি নিউমোনিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।
উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এফ. এম. বাবরা হ্যমালিন জানান, পশুদের শুষ্ক ও উষ্ণ জায়গায় রাখা, প্রয়োজনমতো খাবার সরবরাহ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। শীতজনিত রোগ প্রতিরোধের জন্য পশুপালকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, শীতের কারণে গরু-বাছুরসহ অন্যান্য পশুদেরও সমস্যা হচ্ছে। শ্রমিক ও কৃষকেরা অল্প দিনের মধ্যে কাজ করতে পারছেন না। তীব্র শীতজনিত মানুষের দৈনন্দিন জীবিকা বিপর্যস্ত। উপজেলার আবহাওয়া অনুযায়ী, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, বিকেলে ২১ ডিগ্রি এবং রাতে ১২ ডিগ্রি নামতে পারে। ঘন কুয়াশা ও শীতের কারণে সড়ক ও হাওরের নৌযান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
সৈয়দপুর (নীলফামারী) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, নীলফামারীর সৈয়দপুরে হিমেল হাওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। সোমবার সকাল ৮টায় সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হঠাৎ শীতের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় দিনের কার্যক্রম প্রভাবিত হচ্ছে। শ্রমজীবী মানুষজন, ভ্যানচালক ও খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ রাস্তা বের হতে পারছেন না। ভ্যানচালক আলী হোসেন জানান, প্রচ- ঠান্ডায় হাত-পা অবস হয়ে যাচ্ছে। পিঠা বিক্রেতা রশিদা বলেন, সংসারের জন্য কঠোর ঠান্ডার মধ্যেও কাজে বের হতে হচ্ছে। উপজেলা আবহাওয়া অফিস জানায়, কয়েকদিন আগে রোদ থাকলেও হঠাৎ শীতের প্রবলতা বেড়েছে। পার্শ্ববর্তী তারাগঞ্জ ও পার্বতীপুরেও তীব্র শীত বইছে। শীতজনিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর চাপ বেড়েছে। উপজেলার সাধারণ মানুষ বলেন, শীত ও কুয়াশার কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে। যারা খেটে খাওয়া মানুষ, তারা বিশেষভাবে বিপর্যস্ত।
কলাপাড়া (পটুয়াখালী) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ঘন কুয়াশা ও হিমেল বাতাসে সাধারণ মানুষ বিপর্যস্ত। সোমবার সকাল ৯টায় সর্বনি¤œ তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১২.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতের তীব্রতায় নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষ ও চরাঞ্চলের জেলেরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। খড়কুটো জ্বালিয়ে সামান্য উষ্ণতা নেওয়ার চেষ্টা করছে অনেকে। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ শীতের তীব্রতায় কাজের জন্য বাইরে বের হওয়া সম্ভব নয়। ঘন কুয়াশার কারণে পরিবহন ও নৌযানও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবীরা শীতবস্ত্র বিতরণে চেষ্টা করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। শীতের কারণে শিশু ও বৃদ্ধরা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। স্থানীয়রা সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের সাহায্যের আহ্বান জানাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনজীবন ও কৃষি কার্যক্রম আরও মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে।
ঈশ্বরদী (পাবনা) উপজেলা সংবাদদাতা জানান, পাবনার ঈশ্বরদীতে তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকাল ৯টায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে গেছে। এর আগের দিন রোববার সকাল ১০টায় সর্বনি¤œ তাপমাত্রা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা কমেছে ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
ঈশ্বরদী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের নাজমুল হক রঞ্জন জানান, কয়েকদিন ধরে ঈশ্বরদীর উপর দিয়ে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বইছে। এই শীতের প্রভাবে দিনের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। শনিবার ৯ ডিগ্রি, শুক্রবার ৮ দশমিক ৮ ডিগ্রি এবং বৃহস্পতিবার ৯ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়। তিনি আরও জানান, এই শীতের অবস্থা আগামী কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।
শীতের তীব্রতায় সাধারণ মানুষ কার্যক্রমে ব্যাহত হচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা ঠান্ডাজনিত অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন। কর্মজীবী মানুষ, কৃষক ও দিনমজুররা ঘরের বাইরে বের হতে পারছেন না। এছাড়া শীতজনিত রোগের কারণে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, শীতের কারণে দিনের কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহও প্রভাবিত হচ্ছে। খেটে খাওয়া মানুষ ঘরে আগুন জ্বালিয়ে ঠান্ডা নিবারণের চেষ্টা করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ ও স্বাস্থ্য সচেতনতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। ঈশ্বরদীর তীব্র শীত জনগণ ও কর্মজীবী মানুষের জন্য নতুন ধরনের দৈনন্দিন দুর্ভোগ সৃষ্টি করেছে, যা আগামী কয়েক দিন ধরে আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।



