আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা নতুনভাবে যুক্ত করা হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে নবম-দশম শ্রেণির বিভিন্ন বইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’-বিদ্রোহ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত হচ্ছে।

পাঠ্যবইয়ে জিয়াসহ যুক্ত হচ্ছে যেসব নেতার নাম
ঢাকাঃ দেশের স্বাধীনতার ও মুক্তিযুদ্ধ একই সঙ্গে নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে খালেদা জিয়ার ভূমিকার পাঠও রাখা হচ্ছে। এছাড়া শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নবম-দশম শ্রেণির পৌরনীতি ও নাগরিকতা বইয়ের রাজনৈতিক দলের অধ্যায়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বিষয় যুক্ত করা হয়েছে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাথমিক স্তরের ৩৬টি বই আর মাধ্যমিক স্তরের ৯৫টি বই কর্মশালার মাধ্যমে পরিমার্জন করা হয়েছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, নতুন বইয়ের অন্যতম আলোচিত সংযোজন নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলা সাহিত্য’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের লেখা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ প্রবন্ধ। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এটি পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রবন্ধটির সঙ্গে জিয়াউর রহমানের তৎকালীন একটি ডায়েরির ছবিও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রবন্ধটিতে ১৯৭১ সালের মার্চে চট্টগ্রামে প্রতিরোধের প্রস্তুতি, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অষ্টম ব্যাটালিয়নের সদস্যদের সংগঠিত করা, ‘উই রিভোল্ট’ বলে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত এবং কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের ঘটনা জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণার আলোকে তুলে ধরা হয়েছে। প্রবন্ধের ভূমিকা অংশে স্বাধীনতাকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কৃতিত্ব হিসাবে না দেখে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণমানুষের অংশগ্রহণের ধারাবাহিকতার ফল হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান ও তাজউদ্দীন আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বিভিন্ন শ্রেণিতে রাজনৈতিক ইতিহাস: প্রাথমিকের পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘আমাদের স্মরণীয় নেতা’ অধ্যায়ে শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের পাশাপাশি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার জীবনী যুক্ত হচ্ছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে জিয়াউর রহমানের ‘উই রিভোল্ট’ বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত হচ্ছে।
অষ্টম শ্রেণির বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের ব্রিগেড ফোর্সের বিষয়ও রাখা হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রসত্তা বিনির্মাণের স্থপতিবৃন্দ’ নামে নতুন অধ্যায় রাখা হয়েছে।
এতে রাজা গোপাল, ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ, মীর নিসার আলী তিতুমীর, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, ঈশা খাঁ, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানকে নিয়ে পাঠ থাকছে। একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ও বিশ্বসভ্যতা’ বইয়ে ‘স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ ও গণতান্ত্রিক বিকাশ’ নামে নতুন অধ্যায়ে ১৯৭২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন শাসনকাল ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ যুক্ত করা হচ্ছে। একই বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের কয়েকটি প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং জিয়া স্মৃতি জাদুঘর সম্পর্কেও পাঠ রাখা হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুরুত্ব: ২০২৭ সালের বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিষয়বস্তু আরও বিস্তৃত হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ে ‘শহিদ আনাসের কথা’ শীর্ষক গদ্য এবং নবম-দশম শ্রেণির ইতিহাসভিত্তিক বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ ও তাৎপর্য তুলে ধরা হচ্ছে।
পাশাপাশি ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান জাদুঘর’ ও ‘জুলাই শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ’ বিষয়েও পাঠ যুক্ত হচ্ছে। এর আগে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার তৎকালীন নতুন শিক্ষাক্রম থেকে সরে এসে ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে বই পরিমার্জনের উদ্যোগ নেয়।
২০২৫ সালের বইয়ে বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা ও ইংরেজি বইয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে কবিতা, প্রবন্ধ ও গদ্য যুক্ত করা হয়। পরে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়েও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, ইতিহাসে যার যতটুকু অবদান, তা নিরপেক্ষ ও নির্মোহভাবে পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হচ্ছে। সত্য ও নির্ভুল ইতিহাস শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরতেই সরকার এই উদ্যোগ নিয়েছে।



