নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনে আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের কূটনৈতিক প্রাপ্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে চরম ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেও ভারত বহুপাক্ষিক ঐকমত্য গঠনে নেতৃত্ব দিয়েছে।
অনলাইন ডেস্কঃ ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে সেজেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। আজ শনিবার পর্দা উঠেছে দুই দিনের এ আয়োজনের। এরই মধ্যে ডজনেরও বেশি বিশ্বনেতা দিল্লিতে জড়ো হয়েছেন। জোরদার করা হয়েছে পুরো দিল্লির নিরাপত্তা।
ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যের অধীন থাকা অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিপরীতে একটি ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে ব্রিকস ক্রমশ অবস্থান শক্ত করছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলোই এবারের শীর্ষ সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে।
বৃহত্তর পরিসরে দেখতে গেলে, চলমান যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এ বছরের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

- চীন-ভারত সম্পর্ক: দীর্ঘ ৭ বছর পর চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই সম্মেলনে যোগ দিতে ভারত সফরে আসেন। ভারতের সতর্ক ও দূরদর্শী কূটনীতির মাধ্যমে দুই দেশের সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে আলোচনা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে।
- রাশিয়া-ভারত সম্পর্ক: সম্মেলনের ফাঁকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক দুই দেশের ঐতিহ্যগত প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।

ব্রিকস কী, সদস্য কত
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশ ১১টি। এসব দেশ মিলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এসব দেশের নিয়ন্ত্রণে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা—পাঁচটি দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে নামকরণ করা হয়েছে ব্রিকসের (বিআরআইসিএস)। কাজেই নাম দেখে বোঝা যায়, ব্রিকস হলো এ পাঁচ দেশের জোট।
২০০৬ সালে বাণিজ্য জোট হিসেবে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। শুরুতে সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন। ২০১০ সালে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। পরে জোটের সদস্য আরও বেড়েছে। ২০২৩ সালে এসে ব্রিকসে যোগ দেয় মিসর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
ওই সময় আর্জেন্টিনাকে ব্রিকসের সদস্য হতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু জাভিয়ের মিলেই দেশটির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সাফ জানিয়ে দেন, তাঁর দেশ পশ্চিমাঘেঁষা নীতি মেনে চলবে। তাই ব্রিকসে যোগ দেবে না।
ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে ব্রিকসে যোগ দিয়েছে। বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য দেশ ১১টি। এসব দেশ মিলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ এসব দেশের নিয়ন্ত্রণে।
কারা থাকছেন সম্মেলনে
শীর্ষ সম্মেলনে থাকছেন আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে এসেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা। এর মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট ৭ বছর পর ভারত সফরে এসেছেন।
প্রাথমিক সদস্য হলেও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না। জানা গেছে, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন লুলা। ব্রাজিলের পক্ষে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
ব্রিকস সম্মেলনে আরও থাকছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো ও ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ।
সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানও এবারের সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন।

এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের সময়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এ বছর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিতীয় দফার শীর্ষ সম্মেলনের আগে ব্রিকস নেতারা বৈঠকে বসছেন। ২৪ সেপ্টেম্বর সি চিন পিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ আর মার্কোস জুনিয়র, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট কাসিম-জোমার্ট তোকায়েভ, বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট এভারিস্ত নাদাইশিমিয়ে, নাইজেরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট কাশিম শেত্তিমা, উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসিকা আলুপো, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী লে মিন হুং, কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ পারিয়া, উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিও লুবেতকিন এবং বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাতিফ বিন রশিদ আল জায়ানি ভারতে এসেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

আলোচ্যসূচিতে যা থাকছে
ব্রিকসের মূল লক্ষ্য, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নেওয়া; বিশেষত অর্থনৈতিক বিষয়ে। কাজেই এ বিষয়ের কৌশলগুলো নিয়ে শীর্ষ সম্মেলনে আলোচনা করা হবে—সেটা অনুমেয়।
জোটের নথিপত্র দেখা গেছে, এবারের শীর্ষ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য-সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়া।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে অর্থনীতি শক্তিশালী করায় জোর
ব্রিকসের এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি বিষয়ে জ্ঞান-অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
ফরাসি আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নাটিক্সিসের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ব্রিকসের সদস্য রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আন্তসীমান্ত লেনদেনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়েও নেতারা আলোচনা করতে পারেন।
এ অর্থনীতিবিদ আল-জাজিরাকে বলেন, তবে তাঁরা (ব্রিকস নেতারা) ডলারের বিকল্প খোঁজার চেষ্টা করবেন না বলেই মনে হচ্ছে।
ক্রেমলিন গত বৃহস্পতিবার জানায়, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে মস্কো অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তির বিষয়ে আলোচনা করবে।
ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের জিওস্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রামের চেয়ারপারসন মনোজ কেওয়ালরামানি আল-জাজিরাকে বলেন, ব্রিকস নেতারা যেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন, সেগুলো মূলত সরবরাহব্যবস্থা নিরাপদ রাখা এবং বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের মধ্যে ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
ব্রিকস জোটের সদস্য দেশের সংখ্যা এখন ১১ এবং জোটটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক অংশের প্রতিনিধিত্ব করে।






