আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশন, সংসদ নেতাকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্ত করবেন

56

জাতীয় সংসদের ঐতিহাসিক অধিবেশন আজ। উদ্বোধনী অধিবেশন  সংসদে ভাষণ দেবেন প্রেসিডেন্ট। সংসদ নেতাকে দেয়া হলো স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্তের দায়িত্ব। সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের বিষয়ে উত্তপ্ত হতে পারে সংসদ। উত্থাপিত হবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ।

facebook sharing button
whatsapp sharing button
sharethis sharing button

 

ঢাকাঃ আজ বহুল প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে । এর মধ্যামে দীর্ঘ সতের বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের পর গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের নবযাত্রার সূচনা হচ্ছে। সে বিচারে সংসদের এ অধিবেশন অবশ্যই এক ঐতিহাসিক তাৎপর্য বহন করে। বর্তমান সংসদের সরকারি দলের মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদের প্রথম অধিবেশনকে ঐতিহাসিক আখ্যা দিয়ে বলেন, দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের সংগ্রামের পর গণতন্ত্রের পথে দেশ যাত্রা শুরু করছে। তাই সংসদের এ অধিবেশন অবশ্যই ঐতিহাসিক। সরকারি দল হিসেবে দেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার গুরুদায়িত্ব আমাদের রয়েছে। আর এর সহযাত্রী হিসেবে সংসদের বিরোধী দলও তাদের যথাযথ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করি।

এ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপিত হবে। তবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতি অনুযায়ী অধিবেশনের শুরুতে প্রেসিডেন্টের দেয়া ভাষণ নিয়ে সংকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে চলছে বিতর্ক। সরকারি দল বলছে সাংবিধানিক রীতিতেই সংসদে প্রেসিডেন্ট ভাষণ দেবেন। অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, বর্তমান প্রেসিডেন্ট বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর। তাই সংসদে তার ভাষণ দেওয়ার কোনো অধিকার নেই। ফ্যাসিবাদের দোসর সংসদে ভাষণ দেবে এ জন্য জুলাই অভ্যুত্থানে তরুণরা জীবন দেয়নি। এ অবস্থায় প্রেসিডেন্টের ভাষণ বয়কট করবে বিরোধী দল। অর্থাৎ বিরোধী দলের বয়কটের মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

 

এ ছাড়া ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার বিষয় নিয়ে প্রথম দিনই সংসদের অধিবেশন উত্তপ্ত হতে পারে। গণভোটে হ্যাঁ জয়ী হওয়ায় সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও জামায়াতসহ বিরোধী দলের সদস্যরা শপথ নিয়েছে। কিন্তু সরকারি দল বিএনপির সংসদ সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছে। তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। এ নিয়ে অধিবেশনের শুরুতেই বিতর্ক দেখা দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

 

সংসদ শুরুর আগেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলছে। সরকারি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলছেন, সংবিধানে সরাসরি উল্লেখ না থাকায় এবং শপথের বিধান না থাকায় তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পরিষদকে সংবিধানে ধারণ করার পরই শপথ হতে পারে।

 

 

অধিবেশনের শুরুতেই সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এ ছাড়া প্রথম অধিবেশনে সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর অনুমোদন, সংশোধন অথবা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। এ ছাড়া মরহুম সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাবও গ্রহণ করা হবে। জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন প্রায় এক মাস চলবে। এ সময় প্রেসিডেন্টের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাব এনে আলোচনা হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হবেন এ বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকে সংসদ নেতাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ। তিনি বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। সিদ্ধান্ত তিনি দেবেন। আগামীকাল আমরা জানতে পারব।’

চিফ হুইপ জানান, প্রথমে স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন জ্যেষ্ঠ নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। অন্য একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য অর্থাৎ যার নাম প্রস্তাব করা হবে তিনি সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বে অবিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হবে। চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তারা কোনো ‘পজিটিভ রেসপন্স’ পাননি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তবে বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকার নেয়ার সরকারের যে প্রস্তাব তা প্রত্যাখ্যান করেছে। গতকাল জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠক শেষে এ বিষয়ে জামায়াতের আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জুলাই সনদেই আছে যে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন। আমরা খ-িতভাবে এটা চাচ্ছি না, আমরা চাই প্যাকেজ, আমরা চাই পিস মিল, পুরোটাই সেখানে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হোক এবং এর ভিত্তিতে আমরা যেন আমাদের ন্যায্য দায়িত্ব পালন করতে পারি।

এ ছাড়া সংসদের প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হবে। সেগুলোর অনুমোদন, সংশোধন অথবা বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সংসদ। সেগুলো আইনে পরিণত করতে সময়সীমা মাত্র ৩০ দিন। তবে সব অধ্যাদেশই আইনে পরিণত হবে নাকি কিছু বাদ যাবে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে গেলে বা অধিবেশন না থাকলে প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। এই ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তী সরকারের ৫৫৯ দিনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হয়। এর মধ্যে গণভোট, জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি, বিচার বিভাগের আলাদা সচিবালয়, সরকারি চাকরির বয়স বৃদ্ধি, গুম-খুনের বিচার ও স্থানীয় সরকারসহ বেশ কিছু অধ্যাদেশ বেশ আলোচিত ও স্পর্শকাতর। আইনে পরিণত করতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেই উপস্থাপিত হবে এসব অধ্যাদেশ। পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে অনুমোদন না হলে বাতিল হয়ে যাবে সেসব অধ্যাদেশ। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি প্রথম অধিবেশনে উত্থাপনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। কারণ এটি অধ্যাদেশ নয়, বরং প্রেসিডেন্টের আদেশ ছিল। আইনজীবীরা বলছেন, কোনো অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল হলে ওই সংক্রান্ত সব কার্যক্রম বৈধতা হারাবে। তাতে সৃষ্টি হতে পারে নানা জটিলতা।

এ বিষয়ে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য প্রথম বৈঠকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্ত করবেন তারেক রহমান

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ভার সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপির সংসদীয় দল। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের বৈঠকে সংসদ নেতাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বৈঠক শেষে জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানান জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন। বৈঠকের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার পদে নির্বাচন হবে। নূরুল ইসলাম বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। সিদ্ধান্ত তিনি দেবেন। আগামীকাল (আজ) আমরা জানতে পারব।’

চিফ হুইপ জানান, বৃহস্পতিবার স্পিকারের চেয়ার খালি রেখে অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হবে। শুরুতে একজন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করবেন। এরপর সংসদ নেতা এই সভায় সভাপতিত্ব করার জন্য কোনো একজন সিনিয়র নেতার নাম প্রস্তাব করবেন। কোনো একজন সংসদ সদস্য তা সমর্থন করবেন। তারপর ওই সদস্য (যাঁর নাম প্রস্তাব করা হবে) সভাপতিত্ব করবেন।

চিফ হুইপ জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ বৃহস্পতিবার সংসদে উপস্থাপন করা হবে। এগুলো যাচাই-বাছাই করার জন্য বৃহস্পতিবার বৈঠকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। সে কমিটিতে সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত উদারতা দেখিয়ে বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিষয়ে তাঁরা কোনো ‘পজিটিভ রেসপন্স’ পাননি। পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে সরকারি দলের ছয় হুইপ উপস্থিত ছিলেন।