দেশের একমাত্র রাজধানী ঢাকার নাগরিকরা চরম অবহেলিত অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণের সময় কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা এলেও ঢাকার মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে দৃশ্যমান কোন উন্নতি আসেনি।
নিউজ২১ডেস্কঃ রাজধানী ঢাকার নাগরিক জীবনের মৌলিক সুবিধাগুলো যখন নিয়মিত ব্যাহত হয় তখন বসবাসের প্রাণকেন্দ্রই হয়ে ওঠে ভোগান্তির নগরী। যানজট, পানিবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও সেবার অদক্ষতা সব মিলিয়ে ঢাকাবাসী নানামুখী নাগরিক সঙ্কটে জর্জরিত। অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বগ্রহণের পর দেশজুড়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ঘোষণা এলেও রাজধানী ঢাকায় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা প্রাপ্তিতে দৃশ্যমান উন্নতি আসেনি। এমন অভিযোগ এখন ঢাকায় বসবাসকারী নাগরিকদের। জন্মনিবন্ধন থেকে ট্রেড লাইসেন্স, ময়লা অপসারণ থেকে ড্রেনেজ, গণপরিবহন শৃঙ্খলা থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভোগান্তির কথা জানাচ্ছেন নগরবাসী।
রাজধানীর অধিকাংশ ফুটপাথই দখল হয়ে আছে ভ্রাম্যমাণ দোকান, অবৈধ স্থাপনা বা পার্কিংয়ে। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে সড়কে নামতে হয়, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। ঢাকায় বসবাসের খরচ ক্রমেই বাড়ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিকল্পিত আবাসন প্রকল্পের ঘাটতি ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। রাজধানীতে সরকারি হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত চাপ লক্ষ্য করা যায়। রোগী ও শিক্ষার্থীর তুলনায় অবকাঠামো ও জনবল কম। ফলে সেবার মান ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকার সড়কে যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, রাজনৈতিক সমাবেশ কিংবা মাইকিং সব মিলিয়ে শব্দদূষণ এক নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশেও নিয়মিত শব্দদূষণ হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা কমে গেছে। শিশু-কিশোরদের জন্য পর্যাপ্ত পার্ক ও খেলার মাঠ নেই।
প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি প্রায় সর্বত্রই যানজট এখন নিত্যসঙ্গী। অফিস সময়ে মতিঝিল, পল্টন, তেজগাঁও, মহাখালী, ফার্মগেট, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী কিংবা মিরপুর কোথাও স্বস্তি নেই। মাত্র ৮-১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে যায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। জনসংখ্যার তুলনায় সড়কের পরিমাণ কম, গণপরিবহনের সঙ্কট, অবৈধ পার্কিং ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যানজটের মূল কারণ। রাজধানীতে মেট্রোরেল চালু হলেও তা এখনো সব রুটে পৌঁছায়নি। ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড–এর আওতায় পরিচালিত মেট্রোরেল কিছুটা স্বস্তি দিলেও সামগ্রিক চিত্রে পরিবর্তন খুব বেশি দৃশ্যমান নয় বলছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ঢাকা মহানগরের সেবাদানকারী প্রধান দুই সংস্থা ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) বলছে, তারা সীমিত সম্পদে সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু থাকলেও সার্ভার ডাউন, যাচাইকরণে বিলম্ব এবং অতিরিক্ত কাগজপত্রের কারণে জন্মনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স পেতে দেরির অভিযোগ রয়েছে। ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ মোকাবিলায় নিয়মিত ফগিং ও লার্ভিসাইড ছিটানোর দাবি করা হলেও অনেক এলাকায় তা অনিয়মিত এমন অভিযোগ বাসিন্দাদের। নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধের ঘাটতি ও চিকিৎসকের স্বল্পতাও রয়েছে। রাজধানীতে বাসরুট রেশনালাইজেশনের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক ওভারটেক সংস্কৃতি, নির্ধারিত স্টপেজ মানা না-মানা এবং ভাড়া নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়ে গেছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার ভূমিকা থাকায় সমন্বয়ের অভাব দৃশ্যমান।
এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করে। এর মধ্যে বিভিন্ন কর ও রেইটস, ট্রেড লাইসেন্স ও অন্যান্য লাইসেন্সের কর বাবদ ৩ হাজার ২১২ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়। বাজেটে প্রায় ৭৬ শতাংশ, অর্থাৎ ৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে। এ খাতে ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়।
বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে। এসময় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৪৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। মশা নিয়ন্ত্রণ কাজের জন্য পৌনে ১৮৭ কোটি টাকা টাকা। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, ঢাকা যেন এক ভোগান্তির নগরী। রাস্তায় যানজট, ভাঙাচুরা, ময়লা-আবর্জনা, ফুটপাথ দখল করে দোকান, ধূলাবালি, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ নানা দুর্ভোগে বসবাস করতে হচ্ছে। প্রতিদিনের ময়লা ঠিকমতো নেয়া হয় না। রাস্তার পাশে ফেলে রাখা হয় দিনের পর দিন। ডাস্টবিনের অভাব এবং উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অলিগলিতে আবর্জনার স্তূপ, দুর্গন্ধ এবং মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্প নেয়া হলেও নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন সেবাগুলো নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনা ও তদারকি নেই। ফলে উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছেন না। অধিকাংশ এলাকায় পানির সরবরাহ ও মান নিয়ে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। ঢাকা শহরে প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এই বর্জ্য অপসারণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। কিন্তু পর্যাপ্ত যানবাহন, জনবল ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক এলাকায় নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ হয় না। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে সেবা-ব্যবস্থাপনা রুটিন প্রশাসন দিয়ে চালানো যায় না। দরকার সমন্বিত কমান্ড সেন্টার, রিয়েল-টাইম ডেটা এবং জবাবদিহির স্বচ্ছ কাঠামো।
মতিঝিল এলাকায় এক পথচারী শাহাদাত হোসেন বলেন, দৈনিক বাংলা এলাকায় বর্জ্য সময়মতো না তোলায় দুর্গন্ধে হাঁটা যায় না। রাস্তার পাশে ও রাস্তার উপরে এখন ময়লা ফেলা হয়। ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তায়ও ময়লা ফেলা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন দেখেও যেন না দেখার ভান করছে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা কামরুল হাসান বলেন, যানজট যেন জীবনের গতি থামিয়ে দিয়েছে। প্রতিদিন অফিসে যেতে আমার তিন ঘণ্টা লাগে। পরিবারকে সময় দিতে পারি না। বর্ষা মৌসুম এলেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ডুবে যায় পানিতে। খাল দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অদক্ষতা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন এ সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে।
ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক প্রফেসর আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। সব মেগা ও বিশেষ প্রকল্পের জন্য বাধ্যতামূলক পরিকল্পনা, পরিবেশ ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন অপরিহার্য। দখল ও দূষণে জড়িতদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বহুমাধ্যমভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের ওপর গুরুত্বা দিতে হবে। ফুটপাথ থেকে হকার মুক্ত করার জন্য বহু উদ্যোগই কিন্তু ছিল।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, সিটি করপোরেশনের চলমান সব টেন্ডারের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে বিগত সময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হবে এবং সব অভিযোগের যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করা হবে। শুধু মশার ওষুধ দিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর ফল পেতে সামাজিক সচেতনতা ও মনিটরিং বৃদ্ধি করতে হবে। অবৈধভাবে সিটি করপোরেশনে আর কোনো কাজ হবে না। সবাই মিলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করব।



