প্রশাসন সর্বত্রই জামায়াতের নিয়ন্ত্রণ, বিএনপি গত ‘দেড় বছর’ চেয়ে চেয়ে দেখেছেন

77

পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা উপরে লাইনে এবং বিএনপি ধানের শীষ সপ্তম লাইনে এবং বাহরাইনে চট্টগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থীর আত্মীয়ের বাসায় পোস্টাল ব্যালট ভাগ-বাটোয়ারা ঘটনা ধরা পড়ায় তোলপাড় চলছে। ব্যালটে কিভাবে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক উপরের সারিতে জায়গা পেলো এবং বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ ভেতরের লাইনে চলে যাওয়ার নেপথ্যে কারা?

facebook sharing button
sharethis sharing button

 

 

ঢাকাঃ সারাদেশ নির্বাচনের জোয়ারে ভাসছে। ১২ ফেব্রুয়ারিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সর্বত্রই চলছে উৎসবের আমেজ। একই সঙ্গে চলছে গণভোটের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ নিয়ে সচেতনতা। আর ভোটকে কেন্দ্র করে মানুষের এই উৎসব শেষ পর্যন্ত কতটুকু বহাল থাকবে তা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যেই। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পর্দার আড়ালে নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের ভেতরে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হচ্ছে না তো? বিদেশে জামায়াত নেতার বাসায় ব্যালটের বান্ডিল ভাইরাল হয়েছে। আবার পোস্টার ব্যালটে জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা উপরে রাখার নেপথ্যের রহস্য কী।

 

এটি ঠিক জুলাই অভ্যুত্থানের পর এনসিপি ও অন্তর্বর্তী সরকারের অনুকম্পায় জামায়াত প্রশাসনযন্ত্রের চালকের আসনে বসে গেছে। জামায়াতের রাজনীতিতে স্বর্ণযুগের আবির্ভাব ঘটেছে। সচিবালয়সহ জেলা, উপজেলা প্রশাসনের প্রতিটি সেক্টরে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশে জামায়াত এখনকার মতো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধাজনক অবস্থানে যেতে পারেনি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস এনজিওর কিছু কর্মী, প্রবাস থেকে কিছু ব্যক্তিকে হায়ারে এনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করলেও প্রশাসনের দ-মু-ের কর্তা জামায়াতপন্থিরা। অন্তর্বর্তী সরকারে এই দেড় বছরে জামায়াত সুকৌশলে প্রশাসনকে গ্রাস করে নিলেও বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অবস্থা ছিল অনেকটা হৈমন্তী শুক্লার জনপ্রিয় ‘চেয়ে চেয়ে দেখলাম, তুমি চলে গেলে/আমার বলার কিছু ছিল না’ গানের লিরিকের মতোই। নানান ছলনা, কৌশল, প্রভাব ও ইসলামী চেতনাকে পুঁজি করে জামায়াত নির্বাচনের আগেই রাষ্ট্রের প্রশাসনযন্ত্রকে কব্জা করে ফেলেছে। যার প্রমাণ মিলেছে নির্বাচন কমিশনের অগোচরেই পোস্টার ব্যালটে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ মাঝ কাতারে রেখে জামায়াতের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা সবার উপরে।

 

পোস্টাল ব্যালটে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা উপরে লাইনে এবং বিএনপি ধানের শীষ সপ্তম লাইনে এবং বাহরাইনে চট্টগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থীর আত্মীয়ের বাসায় পোস্টাল ব্যালট ভাগ-বাটোয়ারা ঘটনা ধরা পড়ায় তোলপাড় চলছে। ব্যালটে কিভাবে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীক উপরের সারিতে জায়গা পেলো এবং বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ ভেতরের লাইনে চলে যাওয়ার নেপথ্যে কারা? বিএনপির পক্ষ থেকে এ বিষয়টি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে গোচরীভূত করার পর ইসির দায়িত্বশীলদের ‘অগোচরে হয়েছে’ জবাব রহস্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচন কমিশনে যদি বিএনপিকে সাইজ করতে জামায়াতকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তাদের প্রতীক সবার উপরে দেয়া হয়, তাহলে নির্বাচনে যারা ভোট গ্রহণ করবেন, সেই জেলা রিটানিং, প্রিজাইডিং, পুলিং অফিসারদের অবস্থা কী? যারা নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করবেন; তারা কি নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? নির্বাচন পরিচালনায় দায়িত্বরতরা কী নির্বাচন কমিশনের অগোচরে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে জামায়াতকে জিতিয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন? আর বিএনপি ‘জনগণ ভোট না দিয়ে যাবে কোথায়’-মানসিকতায় ভোটের আগে কে কোন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেবেন, সে প্রহর গুনছে।

 

 

জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালানোর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলেও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ কার্যত স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামায়াতে নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলের শেষের ১০ বছর আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে জামায়াত-শিবির কার্যত ‘গুপ্ত রাজনীতি’ চর্চা করেছে। দলটির ব্যবসায়ী নেতারা স্থানীয় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে মিলেমিশে ব্যবসা করেছে। আর শিবিরের নেতাকর্মীরা ছাত্রলীগের যোগদান করে তাদের হেলমেট বাহিনী, চাপাতি-লাঠিয়াল বাহিনীর দায়িত্ব পালন করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের গুপ্ত রাজনীতি থেকে বেরিয়ে প্রকাশ্যে এসে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়। সে সুযোগে জামায়াত জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষার্থী নেতাদের ব্যবহার করে অনুগত আমলাদের প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি বাগিয়ে দেয়। মূলত ৫ আগস্ট-পরবর্তী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সাবেক সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদের হাত ধরেই শিক্ষা খাতকে জামায়াতিকরণ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন অধিদফতর, বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার, প্রক্টর, প্রভোস্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জামায়াতপন্থিদের বেছে বেছে নিয়োগ দেয়া হয়। পরবর্তীতে কারিগরি ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলাম মাদরাসা শিক্ষা অধিদফতর, বোর্ড, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটসহ মাদরাসা বিভাগের সব দফতর ও প্রতিষ্ঠানকে জামায়াতের আখড়ায় পরিণত করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও একই অবস্থা। আবার স্বাস্থ্য বিভাগেও একই চিত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বদলি হয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিবে দায়িত্ব পাওয়ার পর ড. শেখ আব্দুর রশীদের মাধ্যমে প্রশাসনযন্ত্র কার্যত জামায়াতের ড্রাইভিংয়ে চলতে শুরু করে। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনে কর্মরত আমলাদের অভিযোগ, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিকল্পিতভাবে প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ নানা সেক্টরকে নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে জামায়াত।

 

প্রশাসনকে জামায়াতিকরণের এই চিত্র বিভিন্ন গণমাধ্যমে তুলে ধরে বিএনপিকে সতর্ক করেছে। কিন্তু বিএনপির সিনিয়র নেতারা এসব কানে তোলেননি। জামায়াতের নেতারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতি আমলাদের বসাতে উপদেষ্টাদের সঙ্গে গোপন আঁতাত করেন, সে খবর প্রকাশ পেলেও বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জেগে জেগে ঘুমিয়েছেন। তাদের ভাবখানা লন্ডনে অবস্থানরত দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান সবকিছু করবেন। বিএনপি নেতাদের ব্যর্থতার কারণেই জামায়াত ভিন্ন ভিন্ন আকিদায় বিশ্বাসী ইসলামী ধারার দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনে সক্ষম হয়। শুধু তাই নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত যখন প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করে অনুগত আমলাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর মিশন নিয়ে মাঠে, তখন বিএনপির একাধিক নেতা ফ্যাসিস্ট হাসিনার অলিগার্ক হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তির ব্যবসা বাগিয়ে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত যখন প্রশাসনের পরতে পরতে জামায়াতপন্থি আমলাদের নিয়োগ দেয়; তখন বিএনপির দায়িত্বশীল সিনিয়র নেতারা জেগে জেগে ঘুমিয়ে ছিলেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জামায়াতি চেতনাধারী আমলা ও কূটনীতিকদের বসানো হয়। জনগণের ট্যাক্সের বেতনভুক্ত ওই কর্মকর্তারা দেশের স্বার্থের চেয়ে জামায়াতের স্বার্থকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তারা জামায়াতের আমিরের সঙ্গে ঢাকায় কর্মরত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকের ক্ষেত্র তৈরি করে দেন। শুধু তাই নয়, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘন ঘন বিদেশ সফর এবং জামায়াতের সঙ্গে কূটনীতিকদের বৈঠক পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দূতিয়ালিতেই ঘটছে।

 

বিএনপির পক্ষ থেকে জেলা রিটানিং অফিসার ডিসি এবং উপজেলা রিটানিং অফিসার ইউএনওদের পদে না বসিয়ে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের ওই সব দায়িত্ব বসানোর প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু প্রশাসনে জামায়াতির আমলারা নির্বাচন কমিশনে এত কর্মকর্তা নেই অজুহাত তুলে লটারির মাধ্যমে ডিসি, এসপি ও ইউএনও নিয়োগের ফর্মুলা হাজির করে। অতঃপর লটারির মাধ্যমে ডিসি, এসপি ও ইউএনও পদে কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে নির্বাচনের দায়িত্বে বসানো হয়। লটারিতে নিয়োগপ্রাপ্ত ‘ডিসি-এসপিরা জামায়াতি চেতনার’ অভিযোগ তুলে বিএনপি যাতে বিরোধিতায় সোচ্চার না হয়, সে জন্য উল্টো জামায়াত লটারি পদ্ধতিতে নিয়োগ পাওয়া ডিসি, এসপিদের বিএনপির ‘দলীয়’ আখ্যা দিয়ে সরানোর দাবি তোলে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন সামনে রেখেই প্রশাসনের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের পরতে পরতে জামায়াত অনুসারীদের বসানো হয়েছে। তারা কয়েকটি আসনে জামায়াত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ভোটারদের নিবন্ধন স্থানান্তর করেছেন। প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালট বিদেশে অবস্থানরত জামায়াতের লোকজনের ঠিকানায় পাঠিয়েছে। বাহরাইন ও সউদী আরবে জামায়াত অনুসারীদের হাতে শত শত পোস্টাল ব্যালটের ছবি ভাইরাল হওয়ার পর আরো কয়েকটি দেশে একই অনিয়মের কা- ঘটেছে।

গতকালও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও দক্ষিণ এশিয়ার ভোটারদের পোস্টাল ভোটের গোপনীয়তা ও অনিয়ম নিয়ে অসংখ্য ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। পোল্যান্ড প্রবাসী মোহাম্মদ ইয়াসিন মিয়া (কুমিল্লার ভোটার) তার পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লিখেন, জীবনের প্রথম ভোট দিলাম। তাও আবার ইউরোপ থেকে। দাঁড়িপাল্লা ইনশাআল্লাহ। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি একটি হলুদ বলপেন দিয়ে ব্যালট পেপারের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে টিক চিহ্ন দিচ্ছেন এবং গণভোটের ব্যালটে হ্যাঁ ভোট দিচ্ছেন। ভিডিওটির সাউন্ড হিসেবে ব্যবহার করেছেন জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রচারণার গানটি। আমেরিকার প্রবাসী ফেরদৌস আহমেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি করেছেন, তার নিবন্ধিত পোস্টাল ব্যালটটি তার ঠিকানায় না পৌঁছিয়ে রিসিভড হয়েছে অন্য কোনো স্থানে। ব্যালট ট্যাকিংয়ে তিনি এটি দেখে হতাশা নিয়ে ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘অনলাইনে দেখা যাচ্ছে, আমার বাসায় ব্যালট পেপার পাঠানো হয়েছে কিন্তু আমি পাইনি। অনলাইন ট্র্যাকারে চেক করে দেখি এই আপডেট। প্রকৃত ভোটারের অবস্থা বুঝুন। বাহরাইনের মতো আমাদের ব্যালট হয়তো পোস্ট হচ্ছে কোনো এক নির্দিষ্ট ঠিকানায়। নির্বাচনের এক মাস আগেই ভোটচুরি? আমেরিকান ভোটারদের সাথে এমন হলে মধ্যপ্রাচ্যের লাখ লাখ ভোটারের কি ঘটছে কল্পনা করে নিন। এমনকি কোনো কমপ্লেইন করার হটলাইন কিংবা চ্যাটলাইনও নেই ওয়েবসাইটে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম এ আজিজ বলেছেন, বিদেশে পোস্টাল ব্যালটের বান্ডিল জামায়াত নেতার হাতে; এটি সুপরিকল্পিত। নির্বাচন কমিশনে জামায়াত অনুগতরাই এমনটি করছে। ‘নির্বাচন কমিশনারদের অগোচরে হয়েছে’ এমন বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য।

 

গতকাল বিএনপির পক্ষ থেকে প্রবাসীদের জন্য পাঠানো পোস্টাল ব্যালটে অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেছে বিএনপি। দলটির অভিযোগ, পোস্টাল ব্যালট প্রণয়ন ও বিদেশে প্রেরণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে। এতে তারা (বিএনপি) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রবাসীদের কাছে যে পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তারা আবার উদ্বেগ জানিয়েছেন। সঠিকভাবে বিবেচনা করে এগুলো প্রণয়ন করা হয়নি। যারা এই পোস্টাল ব্যালট প্রণয়নের কাজে ছিলেন, প্রেরণের কাজে ছিলেন বা এগুলোর বিষয়ে যারা দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন, তাদের ব্যাখ্যা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ব্যাখ্যা দিতে হবে।’

 

এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন বিএনপির অভিযোগের কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। কাতার থেকে প্রচারিত আল জাজিরার লন্ডনভিত্তিক সাংবাদিক জুলকার নাইন সায়ের তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে বিদেশে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে দু’টি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, সউদী আরব ও কুয়েতেও বাহরাইনের মতো পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে; কিছু ব্যালট অন্যের কাছে পাওয়া নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এসব ভিডিও ফেক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয়। বিএনপির অভিযোগের পর ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে এবং তদন্ত চলছে। তবে বাস্তবতা হলোÑ ভোট শুধু গণনার প্রক্রিয়া নয়; ভোট একই সাথে জনআস্থার প্রতীক। প্রবাসী ভোট ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং দাঁড়িপাল্লা প্রথম লাইনে এবং ধানের শীষ সপ্তম লাইনে রাখা নিয়ে জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

 

এখন নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রতীক বরাদ্দের আগেই এসব ইস্যুর সুরাহা করা। একই সঙ্গে জামায়াতের বোঝা উচিত, শেখ হাসিনা নীলনকশা করে ভোটে বারবার বিজয়ী হলেও ইতিহাসে তিনি আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত। আর বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের উচিত ‘জনগণ ধানের শীষে ভোট না দিয়ে যাবে কোথায়’ এমন মানসিকতা পরিহার করে এখন থেকে সতর্ক হওয়া। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দিনের পর দিন প্রশাসনকে জামায়াত গ্রাস করার সময় জেগে জেগে ঘুমিয়েছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। ভাবখানা সব কিছুই দায়িত্ব যেন তারেক রহমানের হাতে। এই সিনিয়র নেতাদের ব্যর্থতার কারণে বিএনপিকে ভোট দিতে অভ্যস্ত অনেক ইসলামী ধারার দল জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়েছে। এখন বিগত দিনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বিএনপি নেতাদের সতর্ক হতে হবে, যাতে আসন্ন নির্বাচনে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের কেউ ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করতে না পারেন। বিগত দিনে মানুষ দেখেছে, ইভিএমের নামে যেকোনো প্রতীকে ভোট দিলে তা নৌকা প্রতীকে চলে যাচ্ছে।

 

এখন ইভিএম নেই; কিন্তু জামায়াতের অনুসারীরা প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়ে গেছে। নির্বাচনে বিএনপির অনুগত নেতাকর্মী ও জনতার ভোট দেয়ার দায়িত্ব; কিন্তু সেটি ধরে রাখার দায়িত্ব বিএনপি নেতাদের। বিগত দেড় বছরের মতো জেগে জেগে ঘুমালে ইতিহাস ক্ষমা করবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শাহেদ আলম বলেছেন, ‘মানুষ ভোট দিয়ে বিএনপিকে বিজয়ী করার জন্য মুখিয়ে রয়েছে। তবে বিএনপি নিজেই ইচ্ছা করে ভোটে পরাজিত হতে চাইলে সেটি তাদের উদারতা। কিন্তু নির্বাচনে জামায়াত ক্ষমতায় যাওয়ার ভার দেশ বহন করার সক্ষমতা রাখে কি-না ভেবে দেখতে হবে। ব্যালট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিরুদ্ধে বিএনপি এখনই কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে নির্বাচনী ফলাফল বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। অতএব সময় থাকতে সাবধান!