ধর্মীয় উগ্র রাজনীতি ও রাষ্ট্র: উপমহাদেশের জন্য এক সতর্কবার্তা

256

ঢাকাঃ রাষ্ট্রে কোনো ধর্মীয় উগ্রপন্থী দলকে কোনো দেশের শাসনব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয়। ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতা বারবার এই সত্যই প্রমাণ করেছে। ধর্মভিত্তিক উগ্র রাজনীতি কখনোই সুশাসন, সাম্য কিংবা মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে না। বরং এ ধরনের রাজনীতি সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করে, বিদ্বেষ উসকে দেয় এবং রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পথে ঠেলে দেয়।

এই প্রসঙ্গে ভারতের বিজেপি সরকারের অভিজ্ঞতা একটি বড় উদাহরণ হিসেবে আলোচিত। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতে হিন্দু–মুসলিম সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বেড়েছে—এমন অভিযোগ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে উঠে এসেছে। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূচনা হয়, তার ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে মুসলিমদের মসজিদ ও মাদ্রাসা ভাঙার ঘটনা, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের অভিযোগ সামনে আসে। ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য সরকারি চাকরি, সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা ও বঞ্চনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

এছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় দুই দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ও বিরোধ বৃদ্ধি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব অভিজ্ঞতা উপমহাদেশকে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—ধর্মীয় গোঁড়ামিনির্ভর রাজনীতি রাষ্ট্রকে ঐক্যের দিকে নয়, বরং বিভক্তি ও সংঘাতের দিকেই নিয়ে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বাংলাদেশে যদি জামায়াতে ইসলামী বা অনুরূপ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তবে একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। আশঙ্কার তালিকায় রয়েছে—সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য, মতের ভিন্নতার প্রতি অসহিষ্ণুতা, ধর্মের নামে বিদ্বেষ ও বিভাজন উসকে দেওয়া এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় নিরপেক্ষতার অবসান।

উপমহাদেশের সাহিত্যও এই বিষয়ে আমাদের সতর্ক করে এসেছে বহু আগেই। কাজী নজরুল ইসলাম তার সাম্যের কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন,

“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”

এই পংক্তির মধ্য দিয়ে নজরুল স্পষ্টভাবে বলেছেন, ধর্ম, জাত বা পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষই সর্বোচ্চ। ধর্মের নামে ঘৃণা ও উগ্রতা মানবতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভাবার্থে একই সতর্কবার্তা দিয়েছেন—ধর্ম যখন মানুষকে আলাদা করে, তখন তা আর ধর্ম থাকে না; তা অন্ধতায় রূপ নেয়। এই বাণীগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, ধর্মের আসল উদ্দেশ্য মানবিকতা ও নৈতিকতা জাগ্রত করা, ধ্বংস করা নয়।

সারকথা, ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে শাসন চালানো কখনোই টেকসই বা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হলো ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন, মানবিক মূল্যবোধ এবং সকল নাগরিকের জন্য সমান অধিকার। ধর্মীয় উগ্রতা নয়—এই পথই পারে একটি রাষ্ট্রকে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির দিকে নিয়ে যেতে।

 

সাবেরা শরমিন হকঃ (পরিবেশবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মী, ব্যবসায়ী।) পরিবেশ বিজ্ঞান, নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন অধ্যয়ন, এমবিএ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর,পিএইচডি ফেলোশিপ বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন।