আঞ্চলিক প্রভাবের মূল্য : প্রতিবেশীদের আস্থা হারাচ্ছে ভারত

188

নিজস্ব প্রতিবেদনঃ ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এখন মোটের ওপর জটিল, শীতল ও স্বার্থনির্ভর—আগের মতো স্বাভাবিক বা উষ্ণ বলা কঠিন। বাস্তবতা হলো, ভারতের আঞ্চলিক প্রভাব যত বেড়েছে, ততই অনেক প্রতিবেশীর মধ্যে আস্থার ঘাটতি ও ভেতরের অসন্তোষ জমেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্ক (সংক্ষেপে বিশ্লেষণ)

পাকিস্তান

সম্পর্ক কার্যত অচল। কূটনৈতিক যোগাযোগ ন্যূনতম, সীমান্ত উত্তেজনা ও কাশ্মীর ইস্যু সম্পর্ককে স্থায়ীভাবে বিষাক্ত করে রেখেছে।

নেপাল

ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত, সংবিধান ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগে নেপালের জনগণ ও রাজনৈতিক মহলে ভারতের প্রতি দূরত্ব বেড়েছে।

শ্রীলঙ্কা

অর্থনৈতিক সংকটে ভারত সহায়তা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে ভারতের প্রভাবকে অনেকেই “অতিরিক্ত চাপ” হিসেবে দেখছে। চীন–ভারত ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা স্পষ্ট।

মালদ্বীপ

“India Out” স্লোগানই বলে দেয় পরিস্থিতি। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় মালদ্বীপ ভারত থেকে দূরে সরে চীনের দিকে ঝুঁকছে।

ভুটান

একমাত্র দেশ যেখানে সম্পর্ক এখনও তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, তবে সেটাও ভারতের ওপর অতিনির্ভরতার কারণে—সম্পূর্ণ সমান সম্পর্ক বলা যায় না।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: সবচেয়ে সংবেদনশীল অধ্যায়

একসময় বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে “মডেল রিলেশনশিপ” বলা হতো। কিন্তু বাস্তবে সেই সম্পর্ক ছিল রাষ্ট্র–রাষ্ট্রের চেয়ে সরকার–সরকারকেন্দ্রিক।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার ও তার ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা করে ভারত—
বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতি উপেক্ষা করেছে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও মানবাধিকার প্রশ্নে নীরব থেকেছে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্যের মতো ইস্যুতে একতরফা আচরণ করেছে
ফলাফল কী হলো?

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে ভারতের প্রতি আস্থাহীনতা ও ক্ষোভ তৈরি হলো। সরকার বদলালেই সম্পর্ক নড়বড়ে হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হলো।
এতে কি ভারত উপকৃত হয়েছে?

স্বল্পমেয়াদে:

কিছু কৌশলগত সুবিধাট্রানজিট, নিরাপত্তা সহযোগিতাএকটি অনুগত সরকার

দীর্ঘমেয়াদে:

বাংলাদেশে জনমত ভারতের বিরুদ্ধে গেছে
কূটনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে
বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নেতৃত্বে ভারতের অবস্থান দুর্বল হয়েছে
চীনের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে
অর্থাৎ, কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে ভারত নিজেরই ক্ষতি করেছে।

সারকথা

প্রতিবেশীরা ভারতের আগ্রাসন বা আধিপত্য সহ্য করে সুসম্পর্ক বজায় রাখছে না—বরং ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জনগণের বদলে একটি কর্তৃত্ববাদী সরকারের ওপর ভর করে সম্পর্ক গড়ে তুলে ভারত কৌশলগত ভুল করেছে।

আঞ্চলিক নেতৃত্ব চাপিয়ে দিয়ে নয়, সম্মান, সমতা ও জনগণের আস্থার ওপর দাঁড়ালেই টেকে—
এই সত্যটা ভারত এখনও পুরোপুরি মেনে নিতে পারেনি।

সাবেরা শরমিন হক –(পরিবেশবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজ ও সংস্কৃতি কর্মী, ব্যবসায়ী।) পরিবেশ বিজ্ঞান, নগর পরিকল্পনা, উন্নয়ন অধ্যয়ন, এমবিএ, আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্নাতকোত্তর,পিএইচডি ফেলোশিপ বিশ্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন।