আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন লক্ষ্য রেখে মাঠপর্যায়ে জামায়াতপন্থি পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়নের চেষ্টা করছে চার প্রভাবশালী ব্যক্তি। এসব অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র সচিব সহ পুলিশ সদর দফতরের দু’জন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মিয়া গোলাম পরওয়ার।
ঢাকাঃ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ পুুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতপন্থি কর্মকর্তাদের পদায়নের চেষ্টা করছে প্রভাবশালী চক্র। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি পুলিশ সদর দফতরের মাধ্যমে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এর সাথে পুলিশ সদর দফতরের শীর্ষ দু’জন কর্মকর্তা অতিগোপনীয়তার সাথে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ৬৪ জেলার এসপি, অতিরিক্ত এসপি, এএসপি ও থানার ওসি পদে পদায়নের জন্য জামায়াতপন্থিদের পক্ষে তালিকা তৈরি করছেন।
জামায়াতের হয়ে এ কাজের সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা গোপনীয়তা রক্ষায় রাত ১২টা পর্যন্ত পুলিশ সদর দফতরে বসে সার্বিক তালিকা তৈরি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে স্বরাষ্ট্র সচিব পুলিশ সদর দফতরের দু’জন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে সার্বিক দিক-নির্দেশনা দিচ্ছেন। যা পুলিশ প্রশাসনে ওপেন সিক্রেট। জামায়াতপন্থি সিন্ডিকেট তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন।
এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। সর্বশেষ দেশের ছয় জেলায় নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) বদলি করা হলেও পরে তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
একাধিক সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনকে সামনে রেখে সারা দেশের এসপি, অতিরিক্ত এসপি, এএসপি ও ওসি পদে রদবদল করতে তালিকা তৈরি করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সদর দফতর। খুব দ্রুত ওই রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
একাধিক সূত্র বলছে, সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল অংশ নিয়ে বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতায় আস্থা রাখার উপায় হলো লটারির মাধ্যমে ট্রান্সফার হওয়া। যার যেখানে তকদির আছে, সে সেখানে চলে যাবে। এটা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকবে না।
জামায়াত নেতার এ ধরনের বক্তব্যের পর পুলিশ প্রশাসনে ওসি, এএসপি, অতিরিক্ত এসপি ও এসপি পদে বদলির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও পুলিশ সদর দফতর থেকে একটি চক্র মাঠে নামে। তারা বিএনপিপন্থি’ বা শিক্ষা জীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে পুলিশের কম গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটি বদলির প্রথা চালু করেন।
এরই মধ্যে ওই মিশনের অংশ হিসেবে ঠুনকো অজুহাতে গাজীপুর মেট্রোর পুলিশ কমিশনার ড. নাজমুল করিম এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি ড. আশরাফুর রহমানকে সরিয়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, পুলিশ বাহিনীতে পেশাদার ও সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার ফারুক আহমেদকে র্যাবের অতিরিক্ত ডিজি হিসেবে বদলি করা হয়।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা শনিবার বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জেলা পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত এসপি, এএসপি ও ওসিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতে ইসলামীপন্থি পুলিশ কর্মকর্তাদের অতি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ছাত্র জীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত পেশাদার পুলিশ কর্মকর্তাদের জেলা পুলিশ সুপার পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি জামায়াতকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে মন্তব্যের জেরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পূবাইল থানার ওসি শেখ মো. আমিরুল ইসলামকে ক্লোজড করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। অথচ এখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় নানাভাবে গ্রেফতার ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিএনপির রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত অনেকেই। মিথ্যা মামলায়ও গ্রেফতার করা হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের। কিন্তু এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা পুলিশ সদর দফতর অনেকটাই নিষ্ক্রিয়।
ওই কর্মকর্তারা আরো বলেন, গত বৃহস্পতিবার ডিএমপির ডিবির কতিপয় কর্মকর্তার নির্যাতনের কারণেই মোক্তার নামে গ্রেফতারকৃত এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তিনি একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ছিলেন। অথচ এ ঘটনার দু’দিন হলেও জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের ক্লোজ করা হয়নি। তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে নামকাওয়াস্তে। ডিবির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে সেল্টার দিচ্ছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জামায়াত সিন্ডিকেট। আর এ কারণেই ডিবিতে নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের কর্তাব্যক্তিরা চুপ রয়েছেন।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে পুলিশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এদেশের জনগণ, রাজনৈতিক দলসহ সব মহলের প্রত্যাশা পূরণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পুলিশের কাঁধে। সবার প্রত্যাশা: পুলিশ সামনের জাতীয় নির্বাচনে এমন এক মানদ- স্থাপন করবে, যা শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হবে।
এ লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। দেশের শান্তিকামী সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরে বসে প্রভাবশালী চক্র যদি জামায়াতের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন তাহলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পুলিশ কীভাবে প্রশংসিত হবে!



