দেশে অদ্ভুত নিয়মে উদ্ভট গণভোট!

163

জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। সম্পূর্ণ অবাস্তব ধারণা থেকে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণতঃ গণভোট হয় তখন, যখন আগে সংসদ একটি বিষয়ে ধরুন আইন পাস করলো। সংবিধানে সংশোধনী পাস করে। দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে জনগণ এটিকে গ্রহণ করলো কি করলো না এই প্রশ্নে গণভোট হয়। আগে গণভোট তারপর সংসদ-এমনটি দুনিয়ায় কখনে হয়নি।

copy sharing button
sharethis sharing button

 

ঢাকাঃ হাসিনা সরকার সৃষ্টি করে গেছে গভীর ক্ষত। ইনফেকশন হয়ে সেটি পরিণত হতে চলেছে ক্যান্সারে। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ছে জাতির শরীরে। জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘হ্যাঁ’-‘না’ ভোটকে ‘মুখ্য’ করে তোলা হচ্ছে। গৌণ ইস্যুতে পরিণত হতে চলেছে গণতন্ত্রে উত্তরণের মূল পথ ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন’। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় নির্বাচনের ডেড লাইন দিয়েছে বটে।

 

সরকারের তরফ থেকে জোর গলায় বলাও হচ্ছে, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হবে যেকোনো মূল্যে। পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন অবধি যাওয়ার পথে সৃষ্টি করে চলেছে নানান খানা-খন্দ। অনেকটা মা-কে বিক্রি করার সেই গল্পের মতো। মায়ের এমন মূল্য হাঁকা হবে যাতে কেউ কিনতে না পারে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের রেখে যাওয়া জগাখিচুড়ি মার্কা পথ রেখা কিংকর্তব্যবিমূঢ় ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। যদিও অনেক বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে। তাদের মতে, ভারত এবং জামায়াতের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে সরকার জটিলতার ঘূর্ণাবর্তে পরিস্থিতিকে নিপতিত করেছে।

 

জামায়াত এখন এনসিপি’র মতো কয়েকটি সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে ‘গণভোট’ ইসু্যৃতে মাঠ গরম করবে। যাতে মানুষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আসল কথাটি ভুলে যায় কিংবা বিরক্ত হয়। জামায়াত সৃষ্ট ‘পিআর পদ্ধতির সংসদ’ ইস্যু মাঠে মারা যাওয়ার পর পরই গো ধরেছে গণভোটের। জাতীয় নির্বাচনের আগেই নাকি জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিতে হবে। গণভোট করতে হবে! যদিও বিশ্লেষক এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞগণ জাতীয় নির্বাচনের আগে ‘হ্যাঁ’-‘না’ গণভোটকে উদ্ভট বলে বর্ণনা করছেন। গণভোটকে সামনে এনে গণতন্ত্র উত্তরণের পথ-ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তোলা হয় কি না সেই আশঙ্কাও তাদের।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজন বাস্তবসম্মত নয়। সম্পূর্ণ অবাস্তব ধারণা থেকে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে। তিনি বলেন, সাধারণতঃ গণভোট হয় তখন, যখন আগে সংসদ একটি বিষয়ে ধরুন আইন পাস করলো। সংবিধানে সংশোধনী পাস করে। দ্বিতীয় ধাপে গিয়ে জনগণ এটিকে গ্রহণ করলো কি করলো না এই প্রশ্নে গণভোট হয়। আগে গণভোট তারপর সংসদ-এমনটি দুনিয়ায় কখনে হয়নি। যে বিষয়ে গণভোটের কথা বলা হচ্ছে যে, জুলাই সনদে ৮৪টি ধারা আছে। ৮৪টি বিষয় আছে। মোটামুটি ২৫-৩০ পৃষ্ঠার একটা দলিল। এই দলিল পড়ে জনগণ কেমন করে নির্ধারণ করবে যে এটির পক্ষে কি পক্ষে নয়? ড.শাহদীন মালিকের যুক্তি হচ্ছে, বিশাল এই পড়ে বোঝার জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দরকার, সেই শিক্ষাতো আমাদের বোধহয় শতকরা ২০ ভাগের বেশি ভোটারের নেই। তার মধ্যে ৮৪টি বিষয় পড়ে কেউ যদি মনে করে যে আমি ৫০টির সঙ্গে একমত, কিন্তু ৩৪টির সঙ্গে একমত না। তাহলে কী হবে ? এভাবে গণভোট হয় না।

তিনি বলেন, ধরে নিলাম জুলাই সনদ গণভোটে পাস হলো। তারপর যেটা বলা হচ্ছে যে, সংসদ ২৭০ দিনের মধ্যে এটি যদি গ্রহণ না করে তাহলে আপনাআপনি বাস্তবায়িত হবে। এটিও আইনে দুনিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উদ্ভট ধারণা। গণভোট করার আগে গণভোট সংক্রান্ত আইনও পাস করতে হবে। কিভাবে গণভোট হবে? নির্বাচন কমিশন এটি কিভাবে পরিচালনা করবে? সেই আইনের খসড়াওতো এখন পর্যন্ত হয়নি। এখন গণভোটের কথা বলে আমাদের মূল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ফেরত যাওয়ার যেটি সংসদ নির্বাচন। সেটিই বাধাগ্রস্ত হয় কি না এ আমার আশঙ্কা।

আইনজ্ঞ অ্যাডভোকেট মহসিন রশিদ বলেন, বাংলাদেশকে একটি ‘ডল হাউজ’এ পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে। এসবের অন্য অর্থ হচ্ছে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন না করা। তিনি বলেন, ধরুন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে কি হবে না- এ প্রশ্নে জাতীয় নির্বাচনের আগে একটি গণভোট হলো। যে দেশের বহু মানুষ এখনো নিরক্ষর সে দেশের মানুষ বিষয়টি বুঝলো কি বুঝলো না, আপনি গায়ের জোরে গণভোট বা রেফারেন্ডাম একটি করে নিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে কোনো দল সরকার গঠনের পর যদি একটি আইন করে ওই গণভোট বাতিল করে দেয়? তাহলে যারা আজকে জুলাই জাতীয় সনদ প্রশ্নে গণভোট-গণভোট করছেন তাদের তখন কি করার থাকবে? ‘জুলাই জাতীয় সনদ’র তখন কী হবে? সুপ্রিম কোর্টের রায়ওতো পার্লামেন্টে বাতিল করা যায়। পার্লামেন্ট কি না করতে পারে?

জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে জন সম্মতি রয়েছে কি না, ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ যেটাই থাকুক, বিষয়টি জনগণকে বিস্তারিত বোঝাতে হবে। ব্যাপক হারে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করতে হবে। ‘হ্যাঁ’ হলে কি হবে, ‘না’ হলেই বা কি হবে- মানুষকে জানাতে হবে। নির্বাচনের সময় মানুষ বোঝে শুধু ‘মার্কা’। ‘হ্যাঁ’র মার্কা কী হবে ? ‘না’ এর মার্কা কী হবে? এসব না বুঝিয়েই যদি গণভোট নেয়া হয়, সেটিও সাংবিধানিকভাবে অবৈধ হবে।

আইনাঙ্গনের বাইরের বিশ্লেষকরাও বলছেন, গণভোট এক উদ্ভট ধারণা। স্বাধীনতার পর তিনবার গণভোট হয়েছে। একটি ১৯৭৭ সালে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। দ্বিতীয়টি ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকারের সময়। তৃতীয়টি দ্বাদশ সংশোধনীর সময়। কিন্তু এমন ব্যাপকভিত্তিক সংস্কার প্রস্তাব (৮৪টি) সম্বলিত ইস্যুতে পৃথিবীর কোথাও কোনো গণভোট হয়নি।

বিশ্লেষকরা ‘গণভোট’ এবং ‘জাতীয় নির্বাচন’ করারও ঘোর বিরোধী। দুই ভোট একসঙ্গে করা হলে খরচ এবং সময় সাশ্রয়ী হওয়ার যুক্তিও জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রচার করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যে উদ্দেশ্যে ‘গণভোট’ সেই উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পৃথক গণভোট আয়োজনের অসুবিধা হচ্ছে, আরেকটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো বিশাল আয়োজনের জন্য সরকারকে প্রস্তুতি নিতে হবে। আবার একই দিন জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট পৃথক ব্যালটে হলে ভোটাররা বিভ্রান্তিতে পড়বে। কারণ মানুষ স্থানীয় সরকার, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দুই-তিনটি ব্যালটে ভোট দিতে অভ্যস্ত। সেগুলোতে মার্কা থাকে। মার্কা দেখে মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

 

নাগরিকের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজীকরণের উদ্দেশ্যেই ‘মার্কা’ বা ‘প্রতীক’র প্রচলন করা হয়। প্রার্থীর প্রতীকভিত্তিক প্রচারণা নিরক্ষর ভোটারকে সচেতন করে তোলে। ভোটার তখন বুঝতে পারে কোন্ মার্কায় ভোট দিলে কে জিতবে। আগাম আন্দাজ করতে পারে, কোন্ মার্কার প্রার্থী পাস করলে কী পরিণতি হবে। গণভোটে সেটি বিস্তারিত ব্যাখ্যার সুযোগ কোথায়?

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অংশগ্রহণ থাকলেও নেতৃত্ব ছিলো সচেতন ছাত্রদের হাতে। তারা হয়তো জানেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হলে কী ধরনের উপকারিতা রয়েছে। অন্তর্ভুক্ত না হলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ সেটি অনুধাবন করবে কী করে? জটিল গণভোটের চেয়ে মানুষ বরং সহজ সরল একটি জাতীয় নির্বাচনের জন্যই এখন উন্মুখ।

অধিকাংশ বিশ্লেষকই মনে করেন, গণভোট সম্পর্কে মানুষের ধারণা স্পষ্ট নয়। কি কারণে, কেন এই ভোট দিতে হবে- এটি সাধারণ মানুষ বুঝতে অক্ষম। কারণ তারা মার্কায় ভোট দিয়ে অভ্যস্ত। অধিকাংশ ভোটার তরুণ প্রজন্মের হলেও সবাই বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া নন। জাতির ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা চিন্তিত নয়। প্রান্তিক মানুষ তার জীবন-জীবিকা নিয়ে যতটা আত্মনিমগ্ন, ততোটাই উদাসীন জাতির রাজনৈতিক গুণগত মানের পরিবর্তন নিয়ে।
জুলাই ঘোষণায় কি আছে সেই ধারণা তাদের নেই অধিকাংশ জনগোষ্ঠীর। ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ ভোট- কোনটাতে কি করলে কী পরিণতি হবে সে সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নন। এটার ওপর কিসের রেফারেন্ডাম তাও বুঝতে পারছে না মানুষ। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক,আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় জাতীয় নির্বাচন দিয়ে দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে দেয়া জরুরি।

শুধুমাত্র জামায়াতসহ কয়েকটি ছোট দল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট (জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে) ও সাংবিধানিক আদেশের কথা বলছে। গণভোটকে জাতীয় নির্বাচনের ‘পূর্ব শর্ত’ হিসেবে জুড়ে দিয়েছে দলটি। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, জামায়াত ও সমস্বরে কথা বলা সংগঠনগুলোর নিত্য-নতুন শর্ত, দাবি-দাওয়া জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে অবান্তর, অবাস্তব। জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ নেই। চ্যালেঞ্জ এখন নিত্য নতুন আবদারে অন্তর্বর্তী সরকারের ভ্রƒক্ষেপহীন থাকা।

অর্থনৈতিক অবস্থা ঘোরতর সংগীন। বিনিয়োগ নেই। ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। বেকারত্ব বাড়ছে। বিদেশী দাতা দেশগুলো নির্বাচিত সরকারের অনিবার্যতার কথা বলছে। প্রতিশ্রুত ঋণের অবশিষ্টাংশ ছাড় করার পূর্ব শর্ত হিসেবে জুড়ে দেয়া হয়েছে নির্বাচিত সরকার। অর্থাৎ নির্বাচিত সরকার এলেই তারা তহবিল ছাড় দেবে।

একের পর এক ইন্ডাস্ট্রি বন্ধ হচ্ছে। বেকারত্ব বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে অপরাধ প্রবণতা। পুলিশ প্রশাসন ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। আমলা-কাঠামো জুড়ে রয়েছে আওয়ামীগ ও জামায়াতের আধিপত্য। পুলিশ ও ব্যুরোক্রেসির কাছে সরকার অসহায়। কেউ কোনো কথা শুনছে না। অথচ নির্বাচন কমিশনকে বলা হচ্ছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে। বাস্তবতা যখন গণভোট-পরিস্থিতির প্রতিকূলে তখন গতকাল শনিবার তিন বাহিনীর প্রধানগণ প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। যদিও তাদের মধ্যে কী আলাপ হয়েছে- এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত (সন্ধ্যা সাড়ে ৮টা) জানা যায়নি।

‘হ্যাঁ’-‘না’ গণভোট দাবির চাতুরিতা তুলে ধরে রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহিদ উর রহমান শোরগোল করছেন শুরু থেকেই। কথা বলছেন অত্যন্ত কঠোর ভাষায়। তিনি বলেছেন, মার্কিনীরা চায় নির্বাচন, জাতিসংঘ চায় নির্বাচন। দেশের সব রাজনৈতিক দল, জনগণ চায় নির্বাচন। যারা অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে চায়। আরো বেশি দিন উপদেষ্টা পদ, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকতে চায় তারা মূলত এই ‘গণভোট’ ইস্যু হাজির করেছেন। ভাবখানা এমন যে, নির্বাচন চাইছেন? দিলাম নির্বাচন!

 

গণভোট দেখিতে জাতি ও বিদেশিদের বোঝানো যে সবাই ভোট চায় তাই বাংলাদেশে ভোট হয়েছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, জাতিকে এতো বোকা ভাবেন কেন? জাতি কি কখনো গণভোট চেয়েছে? জনগণ নিজেদের প্রতিনিধিত্ব চায়। ভোট দিয়ে নির্বাচিত সরকার দেখতে চায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও পুঁজি ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তায় নির্বাচিত সরকারের অধীনে বিনিয়োগ করতে চায় বলে উল্লেখ করেন ডা: জাহেদ উর রহমান।