আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ধানের শীষের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে মতবিনিময় দল মনোনীত প্রার্থীর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান। খালেদা জিয়ার ত্যাগ গভীরভাবে স্মরণ করালেন তারেক রহমান।
ঢাকাঃ গতকাল রোববার (২৬ অক্টোবর) বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৫টি সাংগঠনিক বিভাগের প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশীর সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই মতবিনিময় হয়।
এসময় তারেক রহমান মনোনয়নপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আসন্ন নির্বাচনে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে তার পক্ষে কাজ করতে হবে। যারা আসল বিএনপি কর্মী তারা কখনো বিএনপিকে ভাঙবেন না।’
প্রায় ১৯ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে, ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে হামলা, মামলা, গুম-খুন, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার বিএনপি নেতাকর্মীরা। বাদ যায়নি দলটির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও। ১/১১ কিংবা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের সময়ে চাইলেই বিদেশে যেতে পারতেন, নিজে থাকতে পারতেন নিরাপদে কিন্তু দেশ, গণতন্ত্র, দেশের মানুষ ও নেতাকর্মীদের কথা বিবেচনা করে এর পরিবর্তে বেছে নিয়েছিলেন কারাবরণ। যেখানে বিনা চিকিৎসায় বেগম জিয়াকে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়তে হয়েছে, এখনো ভুগছেন চিকিৎসাবিহীন দীর্ঘ কারাবাসের সময়ের অসুস্থতা। গণতন্ত্রের স্বার্থে আপোষহীন থাকায় সহ্য করতে হয়েছে নিজ পরিবারের ওপর নির্যাতনও। কিন্তু তারপরও মাথা নত করেননি ১/১১ কিংবা আওয়ামী ফ্যাসিস্ট কোন সরকারের কাছে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের দীর্ঘ এই লড়াই-সংগ্রামে বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে, গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, জনি, চৌধুরী আলমসহ নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার নেতাকর্মীদের এই ত্যাগের কথা আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিজেদেরকেও দেশ, গণতন্ত্র ও দলের স্বার্থে ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন। একইসঙ্গে আগামী দিনে কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকারও নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। অন্যথায় সকলের জন্য বিদজ্জনক পরিস্থিতির সতর্কতাও দিয়েছেন তারেক রহমান।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময় সভা করছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ। গতকাল সোমবার বরিশাল-রাজশাহী, খুলনা-সিলেট ও ঢাকা বিভাগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে বিভাগভিত্তিক পৃথকভাবে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এসব সভায় তারেক রহমান বিএনপি নেতাদের অতীতে নির্যাতন-নিপীড়ন ও ত্যাগের এসব কথা তুলে ধরেন। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, গতবছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি তখন থেকেই প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে নেতাকর্মীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, ‘আওয়ামী লীগ পালিয়ে গেলেও আগামী নির্বাচন অত্যন্ত কঠিন হবে। এজন্য সাধারণ মানুষের পাশে থাকতে হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে, মানুষের মন জয় করতে হবে। মানুষের আস্থা-বিশ্বাস অর্জন করে ভোটে বিজয়ী হতে হবে।’ নির্দেশনা পেয়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাকর্মীরা তখন থেকেই নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে কাজ শুরু করেন। এসব প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ে সম্প্রতি তারেক রহমান দলের বাইরে জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী বিভিন্ন পেশাজীবী, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করেন। তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করে তিনি প্রায় প্রতিটি আসনে একাধিক জনপ্রিয় প্রার্থী পেয়েছেন বলে জানিয়েছে বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা। তবে প্রতিটি আসনে বিএনপি একক মনোনয়ন দিতে চায়। এজন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। যার প্রথমটি গত রোববার গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে রংপুর, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, কুমিল্লা বিভাগের প্রার্থীদের ডাকা হয়। তাদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অবশিষ্ট বিভাগগুলো নিয়ে গতকাল সভা করেন তিনি।
গতকালকের সভায় উপস্থিত বিএনপির একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশী জানান, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঞ্চালনা ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপতিত্বে সভায় সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্থায়ী কমিটির সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। শেষে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। বক্তব্যের সময় তারেক রহমান ছিলেন বেশ আবেগঘন, তিনি দেশ, জাতি, দল ও দলের নেতাকর্মীদের জন্য বেগম খালেদা জিয়াসহ গুম-খুন, হামলা-মামলা, নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার নেতাকর্মীদের ত্যাগের কথা তুলে ধরেন। বেগম জিয়া কিভাবে নিজের, নিজ পরিবারের সুখের কথা ভুলে গিয়ে কেবল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দেশের মানুষ ও নেতাকর্মীদের কথা চিন্তা করে নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন, কারাবরণ করে নিয়েছিলেন।
তারা আরো জানান, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, প্রতিটি আসনেই একাধিক যোগ্য প্রার্থী তিনি পেয়েছেন। কিন্তু প্রার্থী করতে হবে একজনকে। এজন্য অনেকে যোগ্য হলেও বাদ পড়বেন। তবে এজন্য যাতে দলের মধ্যে কোন ধরণের দ্বন্দ্ব-বিভেদ তৈরি না হয়। সবার আগে দল ও দেশের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পতন হলেও এখনো অদৃশ্য শক্তি ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। ১/১১’র মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি চেষ্টা চলছে। তাই যেকোন মূল্যে ঐক্য ধরে রাখতে হবে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে সকলে লাভবান হবে। কিন্তু বিভেদের কারণে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মনোনয়ন প্রত্যাশীরা জানান, তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তিনি যেন মনোনয়ন পেয়ে এলাকায় আনন্দ মিছিল, মিষ্টি বিতরণ বা এধরণের কোন কিছু না করেন। মনোনয়ন পেয়ে সবার আগে ছুটে যেতে হবে যিনি মনোনয়ন পাননি তার কাছে। তাকে সঙ্গে নিয়েই নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। আবার যিনি মনোনয়ন বঞ্চিত হবেন তিনিও দলের কথা চিন্তা করে যেন মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থীকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। মনে রাখতে হবে, বিএনপি যদি নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসতে পারে তাহলে সকলকেই তার যোগ্যতা অনুযায়ী স্থানে কাজ করার সুযোগ করে দেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু দ্বন্দ্ব-বিভেদের কারণে যদি ভিন্ন কোন পরিস্থিতি আসে তাহলে সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। সভায় উপস্থিত মনোনয়ন প্রত্যাশীরা তারেক রহমানের ঐক্য ধরে রাখার নির্দেশনায় সম্মতি জানিয়ে সমস্বরে অঙ্গীকার করেন।
বরিশাল বিভাগ বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের নেতাকর্মীদের ওপর ১৭ বছর অমানুষিক নির্যাতন-নিপীড়ন করা হয়েছে। আমরা এর জবাব আগামী নির্বাচনে খালেদা জিয়াকে বিজয় উপহার দেওয়ার মাধ্যমে দিতে চাই। আমাদের ওপর চালানো নির্যাতন-নিপীড়নের বড় প্রতিশোধ হবে ধানের শীষের বিজয়। তাই আমরা শপথ নিয়েছি আগামী নির্বাচনে দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে বিজয়ী ছিনিয়ে আনবো।
রাজশাহী বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আমিরুল ইসলাম খান আলীম বলেন, দেশ, জাতি ও গণতন্ত্রের স্বার্থে বিএনপির প্রত্যেকটি নেতাকর্মীকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা সকলে ধানের শীষের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ আছি এবং থাকবো। যদি ঐক্য ধরে রাখতে পারি তাহলে আমাদের বিজয় নিশ্চিত।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা এড. রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ডেকেছিলেন। তিনি সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে বলেছেন। প্রার্থিতা নিয়ে যেন কোন ধরণের বিভাজন, মনোমালিন্য না হয় সেটি সকলকে মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছেন।




