ঢাকাঃ অনেক ঘটা করে অনেক ঢোলসহরত যোগে প্রচার করা হলো যে, ২৪টি রাজনৈতিক দল এবং ঐকমত্য কমিশনের চেয়ারম্যান ড. ইউনূসসহ কমিশনের সমস্ত সদস্য জুলাই সনদে সই করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সনদকে বিশে^র সামনে নজির স্থাপন করবে বলে তার ভাষণে উল্লেখ করেছেন। ড. ইউনূস সাধারণত সুপারলেটিভ ডিগ্রিতে কথা বলেন। যেমন, গত বছর নিউইয়র্কে গিয়ে তিনি ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের এক সভায় সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এবং ক্লিনটনপতœী সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের সামনে বলেন যে, জুলাই বিপ্লব ছিলো, তাঁর ভাষায় মেটিকুলাস ডিজাইন করা একটি বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান। তিনি বর্তমান তথ্য উপদেষ্টা (তখন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী) মাহফুজ আলমকে জুলাই বিপ্লবের মাস্টার মাইন্ড বলে পরিচয় করিয়ে দেন। বাস্তব ঘটনা হলো, ড. ইউনূসের উভয় তথ্যই ছিলো বাস্তবতা বিবর্জিত এবং প্রকৃত ঘটনার সাথে সম্পূর্ণ সংশ্রববিহীন।
আমি গত বছরের ৫ জুন বুধবার থেকে ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্তের ওপর নজর রেখেছিলাম। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সূত্রে প্রতি ২৪ ঘণ্টার দিনলিপি রেকর্ড করে রাখছিলাম। গত বছরের ৫ জুন থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত এই ২ মাসের খুঁটিনাটি তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এই আন্দোলনটি ড. ইউনূনের ভাষায় মেটিকুলাসলি ডিজাইনড বা সুনিপুণভাবে পরিকল্পিত ছিলো না। একটির পর একটি ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটনার পৃষ্ঠে পরবর্তী ঘটনার জন্ম হয়েছে। সূক্ষ্মভাবে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, ১৪ জুলাই শেখ হাসিনার স্বভাবজাত লাগামহীন উক্তিই আন্দোলনের মশালে ঘি ঢেলেছে। আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলায় আন্দোলনকারীরা পাল্টা স্লোগান দিয়েছে, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার’, কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’।
এর পরেই শেখ হাসিনা ছাত্রদের আন্দোলন দমন করার জন্য একের পর এক জুলুমের স্টিমরোলার চালান। পুলিশের সাথে ছাত্রলীগের গুন্ডারা হেলমেট পরে ছাত্রদের ওপর নির্বিচার গুলি চালায়। শুরু হয় ছাত্রজনতা হত্যাকা-। যতো দিন যায় হাসিনার বিভিন্ন বাহিনীর গুলিতে রাস্তায় লাশের পর লাশ পড়তে থাকে। শেষ দিকে প্রতিদিন ৯০ থেকে শতাধিক লাশ পড়তে থাকে। এই ফিনকি দেওয়া তাজা রক্ত দেখে জনগণ আর স্থির থাকতে পারেনি। তারাও লাখে লাখে রাজপথে নেমে আসে।
তাই বলছি, এই গণঅভ্যুত্থান অনেক পরিকল্পনা করে, অনেক স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়নি। এমনকি ৫ আগস্ট যে সরকার একেবারে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে, সেটি ছাত্রনেতারাও ভাবতে পারেননি। তাই, হঠাৎ করে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ায় ছাত্রনেতৃত্বও বেদিশা হয়ে পড়ে। তারা জানতেন না এর পর কী করতে হবে। তারা জাতীয় সরকার গঠনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ব্যর্থ হন। অগত্যা প্যারিসে অবস্থানরত ড. ইউনূসের স্মরণাপন্ন হন।
মেটিকুলাস ডিজাইনের কথা বলে ড. ইউনূস বরং ছাত্র-জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানে বিদেশি রং লাগানোর সুযোগ করে দিয়েছেন। তার মুখের কথা কেড়ে নিয়েই ভারত থেকে বলা হয়েছে যে, এটি হলো মার্কিন স্পনসার্ড অভ্যুত্থান। হাসিনা তো বলেছেন, এটি ছিলো আল কায়েদাদের আক্রমণ।
আলোচ্য ২ মাসে মাহফুজ আলমের ভূমিকা ছিলো শীর্ষ ১০/১২ জন ছাত্রনেতার একজন। মাস্টার মাইন্ড মোটেই নয়। বস্তুত মাহফুজ কেনো, কোনো মাস্টার মাইন্ডই এখানে ছিলো না। এই প্রসঙ্গে আমি বলবো, ড. ইউনূস যেনো অন্তত একটি বই পড়েন। বইটির নাম, ‘জুলাই – মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’। এখন তো দেখা যাচ্ছে যে, যেসব ছাত্রনেতার নেতৃত্বে জুলাই বিপ্লব ঘটেছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্টা-পাল্টা কথা বলছেন মাহফুজ আলম।
॥দুই॥
গত ১৪ মাস ধরে ড. ইউনূসকে দেখছি, তিনি সব সময় মূল সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে যান। প্রধান উপদেষ্টার পদ গ্রহণ করার সময়ই তার ভাবা উচিত ছিলো যে, এটি একটি রাজনৈতিক পদ। অথচ, এই ১৪ মাস ধরে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক ব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন। আর সেটি করতে গিয়ে এই ১৪ মাস দেশে কোনো সুশাসন হয়নি। হয়েছে অরাজকতা ও নৈরাজ্য। ১২ ভূঁইয়ার মতো অনেক ভূঁইয়ার উদয় ঘটেছে।
শীতকালে যেমন বসন্তের গান গাওয়া যায় না, সাহিত্যের আসরে যেমন অর্থনীতির আলোচনা শোভা পায় না, তেমনি জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বঙ্গোপসাগরের অসাধারণ গুরুত্ব, ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সাথে বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগরের গুরুত্বের ওপর বক্তৃতাও জুলাই সনদ অনুষ্ঠানে শোভা পায় না। ড. ইউনূস সেই কাজটিই করেছেন এবং সর্বত্র সেটিই করে থাকেন। সেদিন বরং তার কাছ থেকে জনগণ প্রত্যাশা করেছিলো যে, জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, জুলাই সনদ কীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, গণভোট কখন হবে এবং তার মূল সুর কী হবে? এসব বিষয় তিনি জেনে শুনেই পাশ কাটিয়েছেন, নাকি অন্য কোনো কারণে, সেটি বোধগম্য হয়নি।
জুলাই সনদ নাকি বিশে^র অন্যান্য রাষ্ট্রের জন্য একটি আদর্শ, অন্য কথায় রোল মডেল হয়ে থাকবে। কথাটি তিনি মোটেই ব্যাখ্যা করেননি। কিন্তু আমরা তো দেখছি, মানুষ বলছে, এটি হয়েছে একটি জগাখিচুড়ি। ৩৯ পৃষ্ঠার এই পুস্তকে ৮৪টি সুপারিশ বা প্রস্তাব রয়েছে। এই ৮৪টি সুপারিশের মধ্যে ৩৭টি সুপারিশের সবগুলি দল সহমত পোষণ করেছে। আর ৪৭টি সুপারিশে বিভিন্ন দল নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি তুলেছে। এই সনদ রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করতে তো পারেইনি, বরং তাদের মধ্যকার অনৈক্যকে প্রকট করে তুলেছে।
আমার হাতে ৩৯ পৃষ্ঠার জুলাই জাতীয় সনদ আছে। আমি সেটা মনযোগ দিয়ে পড়েছি এবং অনেক জায়গায় মার্কার দিয়ে মার্ক করেছি। কিন্তু আমার মাথায় আসে না, ৪৭টি নোট অব ডিসেন্টের ওপর কীভাবে মতৈক্য হবে? বলা হয়েছে যে, জুলাই সনদ তফসিল আকারে হোক বা অন্য কোনোভাবে হোক, সেটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। নোট অব ডিসেন্ট কি কোনো দিন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়? বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যার গোড়ায় কী রয়েছে সেটিই তো এই সনদে উল্লেখ করা নাই। পুস্তকে বা আইনে লেখা থাকলেই যে সেটা অনন্তকাল মেনে চলা হবে তার তো কোনো গ্যারান্টি নাই।
॥তিন॥
শহীদ জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক থাকাকালে অনেকগুলো অধ্যাদেশ/ সামরিক ফরমান জারি করেছিলেন। এরপর তিনি প্রেসিডেন্ট হন। অতঃপর তিনি নির্বাচন দেন এবং একটি জাতীয় সংসদ গঠিত হয়। ঐ জাতীয় সংসদ শহীদ জিয়ার ঐসব অধ্যাদেশ/সামরিক ফরমান র্যাটিফাই করে। অতঃপর ঐসব ফরমান ৫ম সংশোধনী নামে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়।
৫ম সংশোধনীতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানকে ইনডেমনিটি দেয়। অর্থাৎ দায় মুক্তি দেয়। কিন্তু ৫ম সংশোধনী তথা ঐসব দায়মুক্তি কি লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর বজলুল হুদা, লে. কর্নেল মহিউদ্দিন আহম্মেদ (আর্টিলারি), লে. কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) প্রমুখের ফাঁসি ঠেকাতে পেরেছিলো? পরবর্তীতে ভারত থেকে এনে ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হয়।
আবার বিপরীত চিত্র দেখুন। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় ১৪ ব্যক্তিকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। এদের মধ্যে জামায়াতের আমীর মওলানা মতিউর রহমান নিজামীও ছিলেন। কিন্তু তাকে অন্য মামলায়, অর্থাৎ যুদ্ধাপরাধের বিচার মামলায় ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। এই মামলায় তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ অন্যদের কারো মৃত্যুদ- কার্যকর হয়নি। বরং তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর প্রমুখ বেকসুর খালাস পেয়েছেন।
যুদ্ধাপরাধ মামলার কথাটিই ধরা যাক। এই মামলায় মওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ জামায়াতের ৫ জন শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদ- কার্যকর হয়েছে। জামায়াতের আরেক নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামেরও মৃত্যুদ- হয়েছিলো। তিনি সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছিলেন। সুপ্রিম কোর্টও সেই মৃত্যুদ- বহাল রেখেছিলো। তারপর আইন মোতাবেক তিনি রিভিউ পিটিশন করেন। এর আগে যাদেরকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছিলো তারাও রিভিউ পিটিশন করেছিলেন। কিন্তু তাদের সকলের রিভিউ পিটিশন খারিজ করে তাদেরকে ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। জামায়াতের তৎকালীন সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের রিভিউ পিটিশনটি শুনানীতে অজ্ঞাত কারণে বিলম্ব হয়। এর মধ্যে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। বর্তমান সুপ্রিম কোর্টে সেই রিভিউ পিটিশনের শুনানী হয় এবং এটিএম আজহারুল ইসলাম বেকসুর খালাস পান। শুধু তাই নয়, তার প্রতি অতীতে হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট যে অন্যায় অবিচার করেছে এবং বিচারের নামে প্রহসন করেছে সেজন্য মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট দুঃখ প্রকাশ করেন।
॥চার॥
জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। আগেই বলেছি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মৌলিক প্রশ্নে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে। সুদীর্ঘ ৮ মাস অসংখ্য বৈঠক করার পরেও সনদ স্বাক্ষরের দিন, অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর জুলাই যোদ্ধা নামের সংগঠনটি সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে ঐ দিন অর্থাৎ ১৭ অক্টোবর জুলাই সনদ সংশোধন করে তাদের দাবির অধিকাংশ মেনে নেওয়া হয় এবং সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জুলাই সনদ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু ৪টি বামপন্থী দল এবং গণফোরাম তার প্রতিবাদ করলে একেবারে শেষ মুুহূর্তে জুলাই ঘোষণাপত্র সংবিধানে রেখে দেওয়া হয়।
এভাবে আপোস করে করে রাষ্ট্রের সংস্কার কার্য সম্পন্ন হয় না। আগামী ৪ মাস কী ঘটবে আমরা জানি না। তবে আমরা চাই, পবিত্র রমজানের আগে নির্বাচনটি হয়ে যাক। ড. ইউনূস সব কিছুতে যে তাল গোল পাকিয়েছেন তার অবসান ঘটুক। আর ভবিষ্যতে যে সরকার আসবে তারা যেনো জনগণের অনুভূতি এবং অভিপ্রায় নিয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
Email:journalist15@gmail.com



