ঢাকাঃ আজ ইসলামের চতুর্থ খলিফা, আমিরুল মু’মিনীন, মাওলায়ে কায়েনাত, শেরে খোদা হযরত ইমাম আলী (কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহুল কারীম)’র শাহাদাত দিবস। মওলা আলি রা. একদম ছোটোবেলা থেকে নবীজির সান্নিধ্য পাওয়া একমাত্র সাহাবি। মক্কায় তখন খরা। তার উপর আবু তালিবের ব্যাবসায় নেমেছে ধস। পরিবার চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন তিনি। নবীজির ভান্ডার তখন যথেষ্ট সমৃদ্ধ। মা খাদিজার সম্পদের মালিক তিনি। যাবতীয় ব্যাবসার দেখাশোনা তাঁর দায়িত্বে। আবু তালিবের কাছে গেলেন। চাচাজি, আপনি তো আমার ভার নিয়েছিলেন, তার কিছুটা শোধ করার সুযোগ দিন। আলিকে আমি নিয়ে যাচ্ছি, জাফর আপনার কাছেই থাকল।
সেই থেকে মওলা আলি নবীজির কাছে। সকল কাজে সাথে সাথে থাকতেন। যতটুক পারা যায় অতটুকুতে হাত লাগাতেন। অবশ্য নবীজির সাথে মওলা আলির রসায়ন শুরু হয়েছে জন্মের পর থেকেই। কাবা অভ্যন্তরে জন্ম নেবার পর যতক্ষণ তাঁকে নবীজি কোলে তুলেননি, ততক্ষণ চোখ খুলেননি। যতক্ষণ নবীজি কোলে তুলেননি, ততক্ষণ কান্না থামাননি। নবীজি কোলে নেওয়ার সাথে সাথে চোখ খুলে ভুবনজয়ী হাসি দিলেন। নবীজি বলে উঠলেন, কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু। আল্লাহ তাঁর চেহারা মহিমাময় করে দিন। নবীজি জানতেন, শিশুর মর্যাদা হবে সুউচ্চ। তাই নাম রাখলেন— আলি।
নবীজি হেরায় গেলেন। মওলা আলিও ছুটে যেতেন। মাঝে মাঝে লাগাতার কয়েকদিন থেকে যেতেন। বয়স কম, এসব বোঝার কথা না, কিন্তু হেরার জ্যোতি তিনি পেয়েছেন সরাসরি নবীজির সাথে থেকেই।
হেরা থেকে নবীজি ফিরলেন। মা খাদিজাকে নিয়ে নামাজে দাঁড়ালেন। আলি দেখলেন, প্রশ্ন করলেন— এটা কী? নবীজি বললেন, এটা নামাজ। আমি চাই তুমিও আমাদের সাথে শরিক হও। মওলা আলি শরিক হয়ে গেলেন। ঘর ছেড়ে নবীজির সাথে মাঝে মাঝে পাহাড়ের উপত্যকায় চলে যেতেন। সেখানে নিরালায় পড়তেন। কেউ জানতো না।
নবীজি প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিবেন। নিকটাত্মীয়দের দাওয়াত দিতে গেলেন। বলে গেলেন— আলি, খাবারের এন্তেজাম করো। তিনি করলেন। খাবার বণ্টনের দায়িত্বও তাঁর। অল্প খাবার চল্লিশ জন মিলে ভরপেট খেলো। নবীজির মোজেজা, প্রকাশ হয়েছে মওলা আলির হাত দিয়ে। নবীজি সবাইকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। কেউ কিছু বলার আগে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। যদিও তিনি ছিলেন সবার ছোটো। বললেন, আর কেউ আপনার পাশে না দাঁড়ালেও আমি দৃঢ়ভাবে আপনার পাশে আছি।
বস্তুুত তিনি পাশে ছিলেন। মক্কার কাফেররা যখন নবীজিকে পাথর মারতে বখাটে লেলিয়ে দিয়েছে, তখন মওলা আলি ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের সামনে। সার্বক্ষণিক তাঁকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। বিপদের আশঙ্কা দেখলে দাঁড়িয়ে যেতেন সামনে। দ্রুত গিয়ে খবর দিতেন অন্যদের।
হিজরতের আদেশ এসেছে। নবীজি চলে যাবেন। বিছানায় শুইয়ে দিলেন মওলা আলিকে। আলি, আমার চাদর গায়ে শুয়ে পড়ো। আলি শুয়ে পড়লেন। কোনো কথা নাই, দরকষাকষি নাই। তাঁর উপর হামলা হতে পারে, কাফেররা নবীকে না পেয়ে তাঁর উপর চড়াও হতে পারে— চিন্তাও নাই!
এভাবে একদম ছোটো থেকে নবীজির হাত ধরে বড়ো হয়েছেন তিনি। আপন সন্তানের মতো করেই। তাঁর সমান সান্নিধ্য, সঙ্গ, অভিভাবকত্ব পায়নি আর কেউ। হিজরতের পরেও এ ধারা ছিল অটুট। সমগ্র আনসার-মুহাজিরদের ডেকে নবীজির ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে আবদ্ধ করবেন। শুরু করলেন মওলা আলির হাত ধরে। বললেন, এই হলো আমার ভাই। তোমরা আজ থেকে এমনই পরস্পর ভাই-ভাই হয়ে যাও।
হিজরতের দ্বিতীয় বছর। মা ফাতেমা বিয়ের উপযুক্ত। চতুর্দিক থেকে সম্বন্ধ আসতে শুরু করেছে। নবীজি সবাইকে ফিরিয়ে দিলেন। বিয়ে দিলেন মওলা আলির সাথে। মওলা আলির দেওয়ার মতো মোহরানা ছিল না। যুদ্ধের হাতিয়ার লোহার বর্ম বিক্রি করে মোহরানা দিলেন। নবীজি মা ফাতেমাকে ডেকে বললেন, “আমি আমার পরিবারের সবচেয়ে প্রিয় পাত্রের সাথে তোমাকে বিয়ে দিচ্ছি।” মসজিদে নববীতে আকদ হলো। স্বয়ং নবীজিই পড়ালেন। উপহার দিলেন বেশ কটি। খাট, তোশক, কম্বল, চাদর, পানির মশক, জাঁতা… মওলা আলিকে বললেন, ওয়ালিমা করাও। কিন্তু তাঁর তো টাকা নাই। কীভাবে করায়? সাদ বিন মুয়াজ রা. মেষের ব্যবস্থা করলেন। কয়েকজন সাহাবি মিলে ভুট্টা আনলেন। ওয়ালিমা কম্প্লিট। তাঁদের ফুলসজ্জার রাতে নবীজি পাত্রে পানি নিয়ে অজু করলেন, বাকি পানি ঢেলে দিলেন মওলা আলির উপর। দোয়া করলেন— হে আল্লাহ, আপনি তাঁদের ভেতর-বাহির বরকতে ভরপুর করে দিন। তাঁদের সন্তান-সন্ততিতেও বরকত দিন।
বদর যুদ্ধের আগের ঘটনা। সাহাবিদের নিয়ে মদিনার পশ্চিমাঞ্চলে অভিযানে গেলেন নবীজি। যাত্রাবিরতির এক ফাঁকে ক্লান্ত মওলা আলি শুয়ে পড়লেন মাটিতে। অল্পতেই ঘুম। নবীজি এলেন তাঁর কাছে। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলেন মায়ার নজরে। তারপর ডাক দিলেন, ওহে মাটির বাপ! চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে পড়লেন তিনি। সলজ্জ ভঙ্গিতে বললেন, লাব্বাইক ইয়া রসুলাল্লাহ। “পৃথিবীতে সবচেয়ে হতভাগা দুজন ব্যক্তি পরিচয় জানতে চাও? একজন সালেহ আ. এর উটের হত্যাকারী, অপরজন তোমার হত্যাকারী!
আয়াত এলো— “বলুন, আমার দাওয়াতের বিনিময়ে তোমাদের নিকট আমার পরিবারের ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু চাই না।” সাহাবিরা আরজ করলেন, ইয়া রসুলাল্লাহ, আপনার পরিবারভুক্ত কারা? নবীজি জবাব দিলেন, “আলি, ফাতেমা, হাসান ও হোসাইন।” ফাতেমা আপন কন্যা, জগত-অতুল, জান্নাতি নারীদের সর্দার। কিন্তু নবীজি প্রথমে উচ্চারণ করলেন মওলা আলির নাম!
মওলা আলির বীরত্ব! কে না জানে। খায়বারের বীরত্ব ঘটা করে প্রচার হয়। কিন্তু মওলা আলির বীরত্ব ছিল প্রতি যুদ্ধেই অতুলনীয়। নবীজির জীবদ্দশায় প্রায় যুদ্ধেই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বদর থেকে শুরু করে উহুদ, খন্দক, বনু কোরায়জা, বনু নাজির, খায়বার, মক্কা-বিজয়, হুনাইন সবটাতে ছিলেন সেনাপতির ভূমিকায়। ‘ফাতহুম মুবিন’ হিসেবে খ্যাত মহা-বিজয় হুদায়বিয়ার সন্ধির লেখকও তিনি।
জ্ঞানগরিমায় মওলা আলির ধারেকাছে ছিল না আর কেউ। আরবি ক্লাসিক সাহিত্যজ্ঞান ছিল তাঁর দখলে। কুরআন, হাদিসের গভীরে তাঁর মতো কেউ প্রবেশ করতে পারেনি। মওলা আলির কাব্যখ্যাতি এখনো বিশ্বজোড়া। অল্প কথায় অতলান্ত সমুদ্রের গভীরে নিয়ে যান। নবীজি তাই বলেছেন, আমি জ্ঞানের শহর, আলি তার প্রবেশপথ।
ইনসাফ ছিল মওলা আলির শিরায় শিরায় প্রবাহিত। নবীজির ঘোষিত পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগ্য ব্যক্তির একজন আবদুর রহমান ইবনে মুলজিম মওলা আলিকে নামাজরত অবস্থায় ছুরিকাঘাত করল। মওলা আলি বিছানায়। অন্তিম মুহূর্তে ইমাম হাসানকে উপদেশ দিচ্ছেন— বাবারে, যে আমাকে আঘাত করেছে তাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়ো। আর যদি প্রতিশোধ নিতে চাও তবে মনে রেখো, সে তোমার পিতাকে কেবল একটাই আঘাত করেছিল। অতএব, তাকে একটার বেশি আঘাত যেন না করো!
বিদায় হজ শেষে ফেরার পথে তাই নবীজি ঘোষণা দিয়েছিলেন— আমি যার মওলা, আলিও তার মওলা। হে আল্লাহ, যে আলিকে মোহাব্বত করে আপনিও তাকে মোহাব্বত করুন। যে আলির সাথে শত্রুতা রাখে, আপনিও তার সাথে শত্রুতা রাখুন।
রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু। আজ মওলা আলির শাহাদাত-বার্ষিকী। আজকের দিনের প্রার্থনা— হে আল্লাহ, আমাদের মওলা আলির মুহিব্বিন হিসেবে কবুল করুন। তাঁর জ্ঞানের অতলান্ত সমুদ্র থেকে কিঞ্চিৎ হলেও দান করুন।




