ফেরদৌস হাসানের উপন্যাস ‘পাতকী’: এক বহুরৈখিক জীবনাখ্যান

792

পরিবর্তিত বাংলাদেশে মহান একুশের প্রথম বইমেলায় শুরু থেকেই বোদ্ধা পাঠকমহলে আলোড়ন তুলেছে বাংলা কথাসাহিত্যের জনপ্রিয় নাট্যকার-নির্মাতা ও ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসানের উপন্যাস ‘পাতকী’। ফেরদৌস হাসানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো কিছু নেই। সেই গতশতকের আশির দশক থেকেই তিনি নিয়মিত টেলিভিশন নাটক রচনা এবং নির্দেশনার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও লিখে চলেছেন নিয়মিতভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর একুশের বইমেলাতে তাঁর একটি করে নতুন উপন্যাস পাচ্ছে পাঠকরা। ‘পাতকী’ সেই ধারাবাহিকতারই ফসল। কী আছে ফেরদৌস হাসানের নতুন উপন্যাস ‘পাতকী’তে? সেই প্রশ্ন না খুঁজে বরং বলা যায়, কী নেই ‘পাতকী’তে? ‘পাতকী’ মূলত স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বাংলাদেশের সময়ের দলিল। ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসান তাঁর ‘পাতকী’তে বিশ শতকের শেষ সত্তর এবং আশির দশকের বাংলাদেশকেই পাঠকের সামনে মেলে ধরার প্রয়াশ চালিয়েছেন।

 ঢাকা, অমর একুশে বইমেলা, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ

May be an image of ৪ people and text

বাংলা একাডেমী করতিক আয়োজিত অমর একুশে বইমেলায় প্রতিবারের মতো এবারেও জিনিয়াস পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে ফেরদৌস হাসানের ‘পাতকী’ উপন্যাস। জনপ্রিয় এই লেখক সম্পর্কে সুধী জনদের কিছু পাঠপ্রতিক্রিয়াটি উপস্থাপন করা হলো।
কিছুতেই গতকাল বইমেলায় যাওয়ার কথা ছিল না আমার। আমি মফস্বলের মানুষ, নির্দিষ্ট কাজ নিয়ে ঢাকা আসি। কাজ শেষ হলে, পারলে, সে মুহুর্তেই মফস্বলে ফিরে যাই। ‘পাতকী’র মোড়ক উন্মোচন বিকেলে জিনিয়াস পাবলিকেশন্সের সামনে, Ferdous Hasan ভাই জানালেন। কাকতালীয়ভাবে আমি তখন ঢাকার পথে। তড়িঘড়ি করে কথামতো সাড়ে চারটায় মেলায় পৌঁছালাম। তখনও কেউ আসেননি। জিনিয়াস থেকে পাতকী কিনলাম। তখন Sanwar Moni ভাইসহ কয়েকজন এলেন। লেখক এলেন আরও দেরি করে। বইটি বাড়িয়ে দিয়ে বললাম, “ভাই কিছু লিখে দেন”। তিনি মিষ্টি করে হাসলেন। দেবেন বললেন। মোড়ক উন্মোচন শেষে মিষ্টি খাইয়ে বিদায় দিলেন, অটোগ্রাফ দিলেন না।
May be a doodle of text
পাতকী
উপন্যাসটি রানা ও স্বর্ণার নিরুদ্দেশ যাত্রার। যে যাত্রায় নদীর পর নদী। কিন্তু নদীর পর যেখানে সাগর সেখানে রানাকে নিয়ে স্বর্ণ জলে নামতে চায়। পুন্যস্নানে। আর রানা চায় এস এম সুলতানের হারিয়ে যাওয়া একটি চিত্রকর্ম। যেভাবেই হোক সেটি পেতে চান শাহাদাৎ চৌধুরী, সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক।
উপন্যাসটির বহুরৈখিকতার কারণে প্রেমের উপন্যাস হিসেবে এর সরলীকরণ দুরূহ। কেননা আরও কাহিনি আছে, যা এ প্রেমাখ্যানের কেবল পটভূমিই তৈরি করেনি বরং রানা-শাহাদাতের সম্পর্কের আবহে সেসব গল্প এগিয়েছে সাপ্তাহিক বিচিত্রার হাত ধরে। দেশবিদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি আর সমাজ-সংশ্লিষ্ট যে গল্পে জড়িয়ে গেছেন ভ্যান গগ, ও হেনরি, মাও সে তুং, রবিশংকর, বড়ে গোলাম আলী, আবুল হাসান, আল মাহমুদ, হুমায়ুন আহমেদ, ববিতা প্রমুখ। শুরুতে, তাই, এটি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু আলো ঠিকরে শিল্পী এস এম সুলতান যখন গল্পে আবির্ভূত হন তখন সবকিছুই ম্লান হয়ে যায়। তাঁর সন্ত রূপ। বৃক্ষ-পশুপাখি-মানবপ্রীতি। তাঁর শিল্পীসত্তার দৈব রূপ—পূর্ণিমার রাতে খোলা প্রাকৃতিতে এক পায়ে ঘুঙুর পরা সুলতান! একসাথে ছয়টি ক্যানভাসে ছবি আঁকছেন নৃত্যরত সুলতান! ফেরদৌস হাসান কি শিল্পী সুলতানকেই আঁকড়ে ধরতে চেয়েছেন ‘পাতকী’ উপন্যাসে?
শেকল-গল্পের উপন্যাস ‘পাতকী’। একের ভেতর অনেক ঘটনার সংযোগ। গভীর মনস্তত্ত্ব, নাটকীয়তা আর প্রাঞ্জল ভাষার কারণে পাঠক উপন্যাসটি পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামবে না।

 

May be an image of 1 person and text that says "ফেরদৌস হাসান পাতকী"
পাতকীর এ পাশ ও পাশ
শেষ হলো পাতকী। এবারের বইমেলায় প্রকাশিত বন্ধু ফেরদৌস হাসানের Ferdous Hasan অনন্য সুন্দর উপন্যাস। নাট্যকার হিসেবেই সমধিক খ্যাতিমান তিনি, নাট্যনির্দেশক, নাট্যপরিচালক, নাটক নিয়েই যত পাগলামি তাঁর। আপদমস্তক নাটকের মানুষ, বলা যায় নাটুকে মানুষও। নাটকের জগতে তাঁর অভিষেক ঘটে প্রবল এক কাব্যানুভূতি নিয়ে। অকালপ্রয়াত দুঃখজয়ী আধুনিক কবি আবুল হাসানের কাব্যশিরোনাম ‘ঝিনুক নীরবে সহো’কে তিনি করেন নাটকের শিরোনাম। এমনই কাব্যপ্রীতি বুকে নিয়ে শুভযাত্রা হয় নাটকের ভুবনে। তারপর নাটকের পর নাটক, নাটকীয় অভিযাত্রা। বিলম্বে হলেও ফেরদৌস হাসানের লেখালেখিতে পাশবদল ঘটে, তিনি আসেন উপন্যাসে। লেখা হয় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। বনবালিকার গান, বাতাস আর পাখির মতো, অলৌকিক বাতাসের গান, কে জেগে আছো, ডাক দিয়ে যায় ; এরই ধারাবাহিকতায় এবারে এসেছে পাতকী।
স্বর্ণ নামের এক মেয়ে। পাতকী। জন্মসূত্রেই সে পেয়েছে এই পাতকী জীবন। এ জীবন থেকে সে পরিত্রাণ চায়। গঙ্গাস্নানের মধ্য পূতপবিত্র হয়ে সে পাতকী জীবনের যবনিকা টানতে চায়। এইটুকুই সে দাবি জানায় এ উপন্যাসের নায়ক রানার কাছে। পরম মমতায় নির্মাণ করেছেন আত্মজৈবনিক এক চরিত্র এই রানা। নাটকের জগৎ থেকে উঠে আসা মানুষ। জনপ্রিয় সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে রানা এক দুর্লভ চিত্রকর্ম সংগ্রহের অভিযানে নামে। অমর শিল্পী এস এম সুলতানের সে চিত্রকর্মে যুদ্ধজয়ী বাঙালির আনন্দ উল্লাসের ছবি ফুটে উঠেছে। আনন্দে মানুষ তার মাথা ছিঁড়ে ফেলছে, হাত-পা ভেঙে ফেলছে। সেই আনন্দয় চিত্রকর্মের সন্ধানে রানা বেরিয়ে পড়ে নড়াইলের উদ্দেশে, শিল্পী সুলতানের কাছে নাট্যকার হিসেবেই পরিচয় দেয়, বিচিত্র জীবনযাপনে অভ্যস্ত সুলতানের বিচিত্র সংসারের মধ্যে অনায়াসে নিজের জায়গাও করে নেয়, সেখানেই পরিচয় এই স্বর্ণের সঙ্গে। সরকারি চাকুরে পিতার পূর্বতন কর্মস্থল নড়াইলের সঙ্গে রানার পরিচয় ক্লাস এইটের ছাত্র থাকাকালে। কিন্তু সুলতানের শিল্পজগতে এসে এবার নিজেকে অন্যভাবে মেলে ধরে। বিশেষ ছবি সংগ্রহের মিশন আছে মাথায়। সে ছবি সংগ্রহে সহযোগিতা করতে চায় স্বর্ণ, শর্ত হচ্ছে গঙ্গাস্নানে পাতকীজীবনের অবসানে রানার সহযোগিতা পাওয়া। দুবলার চর, বানিশান্তা, চিত্রা থেকে বঙ্গোপসাগর অবধি বিচিত্র জীবনে জড়িয়ে পড়া — সত্যিই পাঠককে মোহাবিষ্ট করে রাখেন লেখক। কিন্তু শতেক বিপর্যয় পাড়ি দিয়ে রানা যখন স্বর্ণের নাগাল পায়, তখনই যে সে ভালোবাসা মোহময় জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে রানাকে নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে চলে যাবে পুণ্যস্নানে, পাঠক এমন এক নিষ্করুণ পরিণতির কথা যেন ভাবতেই পারেনি। বিমূঢ় চিত্তে নদীপাড়ে দাঁড়িয়ে পাঠককে দেখতে হয় স্বর্ণের চলে যাওয়া। বেদনাদগ্ধ পাঠক আর পারে না রানার মুখের দিকে ফিরে তাকাতে।
কেবলমাত্র গল্প বলার নাম উপন্যাস নয়। বরং গল্পটা বলার বা গেঁথে উপস্থাপনের কৌশলটা কেমন সেটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। ফেরদৌস হাসান সে কথা ভালোই জানেন। এ উপন্যাস শুরু করেছেন এভাবে : ১৯৭২-এ এই বাড়িতে আমরা থাকতাম। নড়াইলে। চিত্রা নদীর পারে। এটা তখন ছিল জমিদার বাড়ি। বাসার সামনে ছিল বাবার অফিস।
নড়াইলে শিল্পী এসএম সুলতানের বাড়ি বা শিশুস্বর্গ ঘিরে যে উপন্যাসের প্রেক্ষাপট রচিত হবে সেই উপন্যাসের নায়ক রানা নড়াইলবাসের সময়ে তোলা একটি ছবি শাহাদৎ চৌধুরীর সামনে তুলে ধরে। কী চমৎকার কাটা কাটা ছোট ছোট বাক্য। বাক্যের এই আদল জহির রায়হানের গদ্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু নাটকের সংলাপ আর অসংখ্য চিত্রনাট্য রচনা করতে করতে এই গদ্যভঙ্গি ফেরদৌস হাসান নিজের মতো করে রপ্ত করেছেন অনেক আগেই। বিচিত্রা সম্পাদক শাহাদৎ চৌধুরীও সেটা সনাক্ত করেছেন বেশ আগেই।
লেখক এই বইয়েই শাহাদৎ চৌধুরীর জবানিতে জানান : তোমার স্টাইলটা ভালো লাগল রানা, এক-দুই শব্দে বাক্য শেষ করো। সহজসরল শব্দ, সেই তো ভালো ;ইফ ইউ ওয়ান্ট টু ট্রাভেল লং, ট্রাভেল লাইট। প্রকৃতপক্ষে ফেরদৌস হাসানের উপন্যাসে এই লাইট ট্রাভেলের আস্বাদ পাওয়া যায়। সেই গানের কথা মনে পড়ে যায় –‘ এই ছোট্ট ছোট্ট পায়ে চলতে চলতে ঠিক পৌঁছে যাব।’ দূরের পথের যাত্রী, ছোট ছোট বাক্যেই গেঁথে যাবেন লেখক। তা-ই করেছেন তিনি। তাঁর পরিচয় পাবার পর শিল্পী সুলতানও আবদার জানিয়েছেন —
তুমি আমাকে নিয়ে একটা চরিত্র সৃষ্টি করো তো নাট্যকার, ম্যাকবেথ কিংবা ওথেলোর মতো।
ফেরদৌস জানেন তিনি শেক্সপিয়ার নন, তাঁকে দিয়ে হয়তো এমন চরিত্র নির্মাণ হবে না, সে-কথা নিজে মুখে কবুলও করেন ; তবু শিল্পীর আবদার — তুমি তোমার মতোই করো। তবু সংযত লেখক সবিনয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেন, ‘আপনাকে ধারণ করার সাধ্য আমার নেই। ‘
তারপরও মানতেই হবে —‘পাতকী ‘ উপন্যাসের কেন্দ্রে সুলতান না থাকলেও শিল্পী এসএম সুলতানের শিল্পসংসারের চমৎকার ছবি ফেরদৌস হাসানের কলমে উঠে এসেছে। একটি প্রেমের উপন্যাস পড়তে গিয়ে পাঠকের জন্য এ এক পরম পাওয়া বই কি!
May be an image of ৪ people and text
আর্মি অফিসারদেরকে কেন যেন সানগ্লাসে খুব মানায়। আমি তো আর্মি না, তবু ফেরদৌস ভাইকে সানগ্লাস পরা দেখে ছবি তোলার আগে আমিও পকেট থেকে সানগ্লাসটা বের করে চোখে পরলাম। কিন্তু ম্যাচিং ম্যাচিংয়ের বদলে তাঁর পাশে আমাকে লাগলো জোকারের মতো৷
এরপরও ফেরদৌস ভাই আদর করে চা খাওয়াতে নিয়ে গেলেন। গরম গরম পুরি-সিঙারা খাওয়ালেন৷ আর সানগ্লাসটা খোলার পর চোখ দেখে বললেন তাঁর নাটকে আমার স্বভাবের বিপরীত চরিত্রটা আমাকে করতে দিবেন৷
সুন্দরবনে যাচ্ছি৷ হাতে যে উপন্যাসটা দেখা যাচ্ছে সেটিও সুন্দরবনকে কেন্দ্র করেই৷ ভাই বললেন, আমার উপন্যাসটার সাথে মিলিয়ে দেখো তো, নদীগুলোর মিল পাও কি না৷ আরও বললেন, তুমি কিন্তু ইউনিভার্সিটির টিচার৷ বইয়ের রিভিউ লিখলে মিথ্যা প্রশংসা লিখতে পারবা না৷ ওনাকে বললাম, অবশ্যই। সমালোচনা থাকলে নিশ্চয়ই জানাবো। আর মনে মনে বললাম, আমি জানি বইটা ভালো হয়েছে৷ কতটুকু হয়েছে, সেটাই পড়ার অপেক্ষা করছি এখন৷
উপন্যাসঃ পাতকী
লেখকঃ Ferdous Hasan
প্রকাশনীঃ জিনিয়াস
প্যাভিলিয়ন- ৩২
অমর একুশে বইমেলা, ২০২৫

 

May be an image of ২ people and text
ফেরদৌস হাসানের উপন্যাস ‘পাতকী’: এক বহুরৈখিক জীবনাখ্যান
পরিবর্তিত বাংলাদেশে মহান একুশের প্রথম বইমেলায় শুরু থেকেই বোদ্ধা পাঠকমহলে আলোড়ন তুলেছে বাংলা কথাসাহিত্যের জনপ্রিয় নাট্যকার-নির্মাতা ও ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসানের উপন্যাস ‘পাতকী’।
ফেরদৌস হাসানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার মতো কিছু নেই। সেই গতশতকের আশির দশক থেকেই তিনি নিয়মিত টেলিভিশন নাটক রচনা এবং নির্দেশনার পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও লিখে চলেছেন নিয়মিতভাবে। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিবছর একুশের বইমেলাতে তাঁর একটি করে নতুন উপন্যাস পাচ্ছে পাঠকরা। ‘পাতকী’ সেই ধারাবাহিকতারই ফসল।
কী আছে ফেরদৌস হাসানের নতুন উপন্যাস ‘পাতকী’তে? সেই প্রশ্ন না খুঁজে বরং বলা যায়, কী নেই ‘পাতকী’তে?
‘পাতকী’ মূলত স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বাংলাদেশের সময়ের দলিল। ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসান তাঁর ‘পাতকী’তে বিশ শতকের শেষ সত্তর এবং আশির দশকের বাংলাদেশকেই পাঠকের সামনে মেলে ধরার প্রয়াশ চালিয়েছেন। যখন বাংলাদেশের বাঙলির নিজস্ব সংস্কৃতিবোধ, নিজস্ব ফ্যাশন আর রুচি গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। আর এতে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে সাপ্তাহিক বিচিত্রা, পূর্ণিমা, রোববার, নিপুণ প্রমুখ সময়িকীসমূহ।
এ উপন্যাসের সূচনাও হয়েছে সাপ্তাহিক বিচিত্রা-সম্পাদক শাহাদত চৌধূরীকে লক্ষ্য করে লেখকের স্বগত সংলাপ প্রক্ষেপণের মাধ্যমে, এভাবে- ‘১৯৭২-এ এই বাড়িতে আমরা থাকতাম।নড়াইলে। চিত্রা নদীর পারে। এটা তখন ছিল জমিদার বাড়ি। বাসার সামনে ছিল বাবার অফিস। বাবা ছিলেন পুলিশ সাহেব। এসডিপিও।’
সূচনার সংলাপ পাঠক-মনে যে কৌতূহল সৃষ্টি করে তাই-ই তাকে টেনে নিয়ে যায় গল্পের শেষ অবধি। নাট্যকার-ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসানের মোহনীয়-নাটকীয় বর্ণনায় মোহগ্রস্ত পাঠক কোন অলক্ষ্যে যে লেখকের সাথে সাথে নিজেও নড়াইল- সুন্দরবন-দুবলার চর হয়ে গঙ্গায় চলে যান, যেখানে রানার প্রেমাস্পদ স্বর্ণ গঙ্গাস্নানে নেমেছে, সে নিজেও টের পান না। তবে স্নানের আগে রানাকে প্রণামও করে স্বর্ণ। যার বর্ণনা ঔপন্যাসিক ফেরদৌস হাসান এভাবে দিয়েছেন–‘সে হাঁটু গেড়ে বাসে। আমি কিছু বোঝার আগেই, আমার পা ছোঁয়। ওর সেই ভঙ্গি, স্পর্শের ঘোর কাটতেই সময় যায়। দু’দণ্ড।’
তারপর স্বর্ণা জলে নামে। শুভ্র ঢেউ এসে তাকে আলিঙ্গন করে। লেখকের সাথে পাঠকও দেখেন স্বর্ণর পবিত্র গঙ্গাস্নান-দৃশ্য।
‘পাতকী’ যদিও উপন্যাস তবে নাট্যকার ফেরদৌস হাসানের নাটকীয় উপস্থাপনা এবং বর্ণনকৌশল ব্যবহারে অনেকগুলো শেকল-গল্পের সমাহারে তা হয়ে উঠেছে এক বহুরৈখিক জীবনাখ্যান। উত্তম পুরুষে বর্ণিত এ উপন্যাসকে তাই কখনো মনে হয় লেখকের আত্মজৈবনিক (Autobiographical) উপন্যাস। আবার যখন ঘটনার পরম্পরায় আমরা সাপ্তাহিক বিচিত্রার সম্পাদক শাহাদত চৌধুরী, সাপ্তহিক পূর্ণিমার সম্পাদক আতাহার খান, কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিশুদ্ধতম কবি আবুল হোসেন-আল মাহমুদ, বাংলাদেশে আধুনিক চিত্রকলার পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, খ্যাতিমান চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ববিতা প্রমুখদের উপস্থিতি লক্ষ করি তখন ‘পাতকী’কে মনে হয় প্রামাণ্য গল্প (Docufiction)। কিন্তু পুরো উপন্যাস জুড়ে গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র রানা এবং স্বর্ণর যে বিচরণ, তাদের যে কাল্পনিক অভিযাত্রা, সে দিক বিবেচনা করলে ‘পাতকী’কে রোমান্টিক প্রেমোখ্যানও বলা যায়। আমি তাই ‘পাতকী’কে প্রকরণের কোনো ছাঁচে ফেলে মূল্যায়ন করতে চাচ্ছি না। আমি শুধু লেখকের গল্প বলার মুনশিয়ানা আর গল্পের গাঁথুনির পারঙ্গমতার কথাটাই বলতে চাই–যা আমাকে মুগ্ধ করেছে, মোহগ্রস্ত করেছে। আমি নিশ্চিত, পাঠকরাও ‘পাতকী’র মলাট খুলে পড়তে বসলে আমার মতোই মোহগ্রস্ত হবেন। শেষ না করে উঠতে পারবেন না। তাই সবাইকে ‘পাতকী’ পাঠে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।
May be an image of ৩ people and text
পাতকী
এই মাত্র শেষ হলো পাতকী।
ফেরদৌস হাসানের সর্বশেষ বই। যারা ফেরদৌস হাসানের বইয়ের জন্যে বই মেলায় যান, তাঁদের জন্যে দুঃসংবাদ। বইমেলা উদ্বোধনের আগেই বইয়ের প্রথম মূদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। এরকম তাজ্জব কথা আমি এর আগে শুনিনি। জিনিয়াস প্রকাশনী থেকে আমার বইও এবার মেলায় আসছে। তাঁরা জানেন আমি ফেরদৌস স্যারের একজন ভক্ত পাঠক। সেই সৌজন্যেই হয়তো বইটির একটি পিডিএফ কপি পাঠিয়েছেন ই মেইলে।
সকালে কাজে গিয়ে ইমেইল খুলে কাজের বদলে বইয়ে ঢুকে পড়েছি। আমার ওয়ার্ক স্টেশনটা সেলস ফ্লোর আর ব্যকরুমের দরজার পাশে। যাওয়া আসার পথে সবাই মনে করছে আমি গভীর মনোযোগে কিছু একটা করছি। চাইনিজ নিউ ইয়ার চলে গেল। এর পর ভ্যালেন্টাইন্স ডে, রিটেইলে সারা বছরই কিছু না কিছু লেগে থাকে। উৎসব, মেমোরিয়াল, সব আসলে ব্যবসার ধান্ধা। একটা শেষ হতে না হতেই প্লে- বুকে আরেকটার পূর্বাভাষ চলে আসে। আমি সেগুলি দেখে মার্চেণ্ডাইজিঙের প্ল্যান করি। কোন মনিহারী কিভাবে সাজালে ক্রেতার মন হরণ করবে। সেসব নিয়ে ভাবাভাবিও আমার কাজের আওতায় পড়ে। ফেরদৌস হাসানের পাতকী আমাকে সে সব করতে দিচ্ছে না।
৪০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়ার পর মনে হল, আর কিছুক্ষণ এই ভাবে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে সহকর্মীরা আমার চালাকি ধরে ফেলবে। বিশ্বাস একবার ভাঙলে জড়া লাগা কঠিন। বইটা ছেড়ে উঠতেও ইচ্ছে করছিলনা। তারপরও উঠতে হল। বাসায় গিয়ে শেষ করলাম বাকী টুকু।
ফেরদৌস হাসানের লেখায় চমক থাকে। এবারের গল্পের আলোচিত অঞ্চল নড়াইল থেকে দুবলার চর পর্যন্ত। এই গল্পটা আমি পাঠকদের আগে থেকে বলে দিতে চাইনে। গল্পের অনেক মোড় অনেক চমক।
গল্পটা শুরু হয়েছে একজন লেখককে নিয়ে যিনি জন্মগ্রহণ করেছেন একজন জাদরেল পুলিশ অফিসারের ঘরে, বড় হয়েছেন অসম্ভব মায়াময় একটি পরিবেশে, তবে তাঁর অন্তর্গতঃ বোহেমিয়ায়ানিজম তাঁকে অসাধারন সব পরিবেশ ও পরিস্থিতির মোকাবেলা করিয়েছে।
বসের নির্দেশে এস এম সুলতানের একটি ছবির খোঁজে তাকে নড়াইলের মাছিমদিয়া যেতে হয়। শৈশবের কিছুদিন তাঁর নড়াইলে কেটেছিল। কিছু ছবির মত স্মৃতি ছিল নড়াইল সম্পর্কিত। তিনি মাছিমদিয়া গিয়ে সেই স্মৃতির মুখোমুখি হন। প্রেমে পড়েন কৈশোরে দেখা এক বালিকার। তারপরের টুকু পাঠককে পড়ে নিতে হবে। আমি বলব না।
এই উপন্যাসের অনেক পাত্রপাত্রীই আমাদের পরিচিত। প্রথম দিকে আমার এটিকে আত্মজৈবনিক উপন্যাস মনে হয়েছিল। এসএম সুলতানের জীবন যাপন, জীবন দর্শন, এবং আঁকা আঁকি তিনি অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিচিত্রার শাহাদত চৌধুরীর যাপিত জীবনের যে অংশটুকু পাতকীতে এসেছে তাও অসাধারণ।
ফেরদৌস হাসানের লেখা পড়ার সময় প্রতিবারই মনে হয় সমাজ সম্পর্কে তাঁর ভাবনা চিন্তা গুলি অন্যদের মত নয়। মানুষের মধ্যে ধর্মের, অথবা কর্মের কারণে ভেদাভেদের বিপক্ষে বরাবরই তাঁর অবস্থান। এই উপন্যাসের শেষে স্বর্ণের বেদনাবিধুর বিদায়ের কথা পড়তে পড়তে মনে হল রানা আর স্বর্ণের মিলন হলে ক্ষতি কী হতো!
পাতকীর প্রথম সংস্করণটি বেহাত হয়ে গেছে। মানে বিক্রি হয়ে গেছে। আর সংস্করণের প্রথম কপিটি গীতিকবি জামিল রায়হানের দখলে। তিনি জানালেন তিনি পাতকী পড়ে কাঁদছেন। আমার খুশি হওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হলো বই পড়ে কাঁদার বয়সটা তিনি পেরিয়ে এসেছেন। মানে তিনি তো আর সেই কোমল মতি কিশোর নন। আমি যদ্দুর জানি তিনিই এখন কাঁদান। মানে অনেকেই তাঁর জন্য কাঁদে!
যাই হোক, বয়ষ্ক কেউ যদি কাঁদেন তাহলে আমার ভয় করে। একবার হলো কি আমি এক সিনেমার প্রযোজককে গল্প শোনাই। তিনি আমাকে দিয়ে গল্পটি লিখানোর আগে গল্প শুনতে চাইলেন। আমি যতই শোনাই তিনি তত কাঁদেন। আমি মনে মনে খুশি হই। কারণ যে সিনেমা যত কাঁদায় সেটি বক্সঅফিস হিট করে!
আমি গল্প বলা শেষ করে প্রযোজকের কান্না থামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি,কারণ কিছুতেই তার কান্না থামছিল না। শেষমেশ তিনি পানি-টানি খেয়ে সুস্হির হলে জিজ্ঞেস করি এ-তো কাঁদছিলেন কেন?
তিনি ফোঁপাতে ফোপাঁতে বললেন,এই গল্পের পেছনে যদি টাকা ঢালি তাহলে আমাকে ঘটি বাটি বিক্রি করে বউ-বাচ্চা নিয়ে পথে নামতে হবে, ভিক্ষের থালা হাতে করে পথে পথে ঘুরতে হবে, আমি সেটা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছিলাম বলে ভয়ে কাঁদছিলাম…
তাই Jamil Raihan পাতকী পড়ে কাঁদছেন শুনে সেই প্রযোজকের কথা মনে পড়ে গেলো। সে-রকম কিছু হলো কি-না দুশ্চিন্তা হচ্ছে! আল্লাহ রহম করুন…
May be an image of ৫ people and text

 

আমার রচিত উপন্যাস ‘পাতকী’ পাওয়া যাচ্ছে রকমারি.কম আর পাওয়া যাবে জিনিয়াস পাবলিকেশন্স, ৩২ নম্বর প্যাভিলিয়ন,সোহরাওয়ার্দী উদ্যান,অমর একুশের বইমেলা।