সংস্কার কমিশনের সব প্রস্তাব গ্রহণ করলে ইসির স্বাধীনতা খর্ব হবে : সিইসি

157

নির্বাচন কমিশন সংস্কারের সুপারিশে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আপত্তি। সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ, তিন সুপারিশের ব্যাপারে কঠোর সমালোচনা করেন।

ঢাকা –নির্বাচন সংস্কার কমিশনের কয়েকটি প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সব প্রস্তাব গ্রহণ করলে ইসির স্বাধীনতা খর্ব হবে বলে মনে করে কমিশন। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ইসিকে দায়বদ্ধ করার জায়গা তৈরির সুপারিশ করেছে সংস্কার কমিশন। তবে ইসির দায়বদ্ধতা তৈরির জায়গাটিকে স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হিসেবে মনে করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য গঠিত কমিশনের অন্তত তিনটি সুপারিশ নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে ইসির স্বাধীনতা ‘খর্ব’ হবে এবং নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে না।

রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত ‘আরএফইডি টক’ অনুষ্ঠানে সিইসি এএমএম নাসির উদ্দিন এসব মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিশেষভাবে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তদন্ত এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা ব্যবস্থাপনা আলাদা একটি স্বাধীন কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়ার সুপারিশে তিনি অত্যন্ত নাখোশ।

নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশন, যেটি ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি তার প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, তার মধ্যে তিনটি মূল সুপারিশ রয়েছে, যা নিয়ে সিইসি গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রথম সুপারিশটি হলো, নির্বাচন কমিশনাররা সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে বা শপথ ভঙ্গ করলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে তদন্ত করার সুপারিশ। এ সুপারিশে বলা হয়েছে যে, যদি নির্বাচন কমিশনের কোনো সদস্য তাদের দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি তদন্ত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ পাঠাবে।

দ্বিতীয় সুপারিশে ভোটার তালিকা এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণের জন্য একটি স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে, এবং তৃতীয় সুপারিশে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন সংস্থা একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এসব সুপারিশ সম্পর্কে সিইসি বলেন, ‘যে জুতা আপনি পরছেন, তার পেরেক কোথায় আছে, সেটা আপনি জানবেন। নির্বাচন কমিশন ইস্যুতে অনেক সুপারিশ দেওয়া যায়, কিন্তু বাস্তবায়নকারীরা জানেন, এগুলো বাস্তবায়নযোগ্য কি না। আমরা যখন ভেতরে আছি, তখন বুঝতে পারি কোথায় সমস্যা হতে পারে।’

এমনকি সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও ভোটার তালিকা তৈরি করার দায়িত্ব যদি ইসির বাইরে অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে চলে যায়, তাহলে ইসির স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে এবং নির্বাচনের কার্যক্রম ব্যাহত হবে বলে মনে করেন সিইসি।

তিনি বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ আমাদের সাংবিধানিক ম্যান্ডেটের মধ্যে পড়ে। যদি আমাদের কাছ থেকে এটি নিয়ে নেয়া হয় এবং স্বাধীন কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়, তাহলে নির্বাচনের সময়সীমা নির্ধারণে সমস্যা তৈরি হবে। আমরা যদি সীমানা পুনর্নির্ধারণের দায়িত্ব না পাই, তাহলে সময়মতো এবং সঠিকভাবে এটি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে না।

নির্বাচন কমিশন বর্তমানে ভোটার তালিকা হালনাগাদ এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণের কাজে একযোগে নিযুক্ত রয়েছে। তবে, এসব কাজের জন্য নির্বাচনী কমিশনের স্বাধীনতার ওপর কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি হলে তা প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে সিইসি বিশ্বাস করেন।

বিশেষভাবে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করতে গিয়ে কমিশনের জনবল এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে সিইসি বলেন, ‘আমরা জানুয়ারির ২০ তারিখে ভোটার তালিকা হালনাগাদ শুরু করেছি। আগামী মে মাসের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে। কিন্তু যদি অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ এর দায়িত্বে থাকে, তাহলে আমার নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।’

পরবর্তী সুপারিশে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সম্মানিভাতার বিষয়ে আলাদা একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। সিইসি বলেন, ‘আমরা নির্বাচন কমিশনের সকল কর্মকাণ্ডে স্বাধীনভাবে কাজ করি। তবে, সংসদীয় কমিটির অধীনে কাজ করা আমাদের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হতে পারে।’

তিনি আরো বলেন, ‘‘এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সংসদীয় কমিটির হাতে ইসির বাজেট এবং জনবল সংক্রান্ত বিষয়গুলো তুলে দিলে আমাদের কাজ ব্যাহত হবে।’সিইসি বলেন, ‘‘আমরা যে স্বাধীনভাবে কাজ করি, তা রাখতে হলে এই সুপারিশগুলো থেকে সরে আসতে হবে।’

সিইসি আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘‘নির্বাচন কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, এটি একটি জটিল প্রক্রিয়া। আগামী ডিসেম্বরে যদি নির্বাচন করতে হয়, তাহলে আগামী অক্টোবরের মধ্যে আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে বর্ষাকালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি, তবে এ বছর নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে এবং তা নিশ্চিত করতে হবে।’’

যদিও সংস্কার কমিশনের অনেক সুপারিশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যেমন নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের সম্মানিভাতা সম্পর্কিত একটি কমিটি গঠন এবং এনআইডি সেবা ইসির অধীনে আনা, তবে অন্যান্য সুপারিশ নিয়ে এখনও সিইসি সংশয় প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, ‘‘সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এখনও আসেনি, তবে তার সারাংশ আমরা ইতোমধ্যে পেয়েছি। এর মধ্যে কিছু সুপারিশ গ্রহণযোগ্য হলেও অনেকগুলো নিয়ে আমাদের উদ্বেগ রয়েছে।’’

সিইসি বলেন, ‘‘ভোটার নিবন্ধন, সীমানা পুনর্নির্ধারণ এবং দলের নিবন্ধনসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। এসব প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং আইনি জটিলতার কারণে আটকে রয়েছে।’’

তিনি শেষ করে বলেন, ‘‘নির্বাচনের সঠিক পরিবেশ তৈরি করতে আমাদের বেশ কিছু প্রস্তুতি রয়েছে। তবে সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো যাতে বাস্তবায়িত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং কার্যক্রমে কোনো বাধা সৃষ্টি না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’’