ঢাকাঃ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন দলটির সভাপতি শেখ হাসিনা। এরপর থেকে আত্মগোপনে দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের নেতারা। দেশজুড়ে শেখ হাসিনা ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতাকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। নেতাদের পক্ষে আদালতে আইনজীবীও মিলছে না। নেই কোনো দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে করণীয় কোনো নির্দেশনা না পাচ্ছেন না বলে দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীরা। এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে- আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ কী? আগামীর রাজনীতিতে তারা কীভাবে কী করবে?
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলটির তৃণমূলের কয়েকজন নেতা ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, সরকার পতন হওয়ার পর থেকে আমরা আতংকে রয়েছি। যে কোনো মুহূর্তে আমাদের ওপর হামলা-মামলা হতে পারে। দলের এই করুণ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় কোনো নির্দেশনাও পাচ্ছি না। যারা দলের নাম ভাঙিয়ে অর্থ-সম্পদ অর্জন করেছেন, তারা পালিয়ে গেছেন। আমরা কোথায় যাব?
* দেশজুড়ে একের পর এক মামলা
* হেভিওয়েট কয়েকজন গ্রেফতার
* পলাতক সব স্তরের নেতাকর্মী
* নেই কোনো কর্মসূচি
* ক্ষমতায় থাকাকালীন অন্যায়ের দায় বলছেন অনেকে
টানা সাড়ে ১৫ বছর রাষ্ট্র শাসন করেও বর্তমানে চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দলটি। দেশের প্রাচীনতম দলটি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাত্র ২০ দিনের মধ্যেই যেন হাওয়ায় মিলে গেছে। কোথাও কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীকে দেখা যাচ্ছে না। নেই কোনো কর্মসূচি। পরিষ্কারভাবে বর্তমানে রাজনীতিতে একটা কঠিন সময় পার করছে আওয়ামী লীগ। এরই মধ্যে দলটিকে নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে রাজপথে সোচ্চার বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ও নিবন্ধন বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছেন মানবাধিকার সংগঠন সারডা সোসাইটির পক্ষে নির্বাহী পরিচালক আরিফুর রহমান মুরাদ ভূঁইয়া। সব মিলিয়ে কঠিন এক দুঃসময় পার করছে দলটি।
এর আগে, গত ২৩ জুন দলের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর হিরকজয়ন্তীও পালন করেছে দলটি। জাঁকজমকপূর্ণ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালনকালে সর্বত্র আধিপত্য বিস্তার করেন নেতাকর্মীরা। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর পুরো দৃশ্যপট পাল্টে যায়। দলটির সব পর্যায়ের নেতাকর্মী এখন পলাতক। কেউই এগিয়ে এসে দলের হাল ধরছেন না। পঁচাত্তরের আগে-পরেও আওয়ামী লীগ অনেক দুঃসময় পার করেছে। তবে কখনো নেতৃত্বের সংকট হয়নি দলটিতে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতায় থাকাকালীন আওয়ামী লীগ দল ও সরকারের মধ্যে তফাৎ তৈরি করতে পারেনি। সরকারে বিলীন হয়ে যায় আওয়ামী লীগ। টানা ক্ষমতায় থাকায় সুযোগ-সুবিধা নেয়াই ছিল দলটির নেতাকর্মীদের প্রধান লক্ষ্য। দলের অভ্যন্তরে স্বার্থের দ্বন্দ্বে বিভক্তি বেড়ে যায়। ক্রমন্বয়ে দলটির নেতাকর্মীরা জনগণ থেকে দূরে সরে যায়। দায়িত্বশীল নেতারা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে তখন চিন্তা করেননি। ক্ষমতায় থেকে যে নির্বাচনগুলো আওয়ামী লীগ করেছে, তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক ছিল। শেখ হাসিনা সরকার এমন অনেক কাজ করেছে যা আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতা ডেইলি বাংলাদেশকে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকেই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি দল। কোটা আন্দোলন ঘিরে পরিস্থিতি এত দ্রুত বদলাবে এটাও আমরা ভাবিনি।
তিনি বলেন, আন্দোলন ঘিরে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়বেন- এটা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি দলের কেউ। তবে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়েছে। নতুন করে এখন দুঃসময়ে পড়েছে দল। এখন সঠিক দিকনির্দেশনার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আরও কোনো পথ নেই।
গাজীপুরে শেখ হাসিনা-কাদেরসহ ৮৫ জনের নামে আরো একটি হত্যা মামলা
গাজীপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেয়া রংপুরের পীরগাছা এলাকার বাসিন্দা ও স্থানীয় রাজমিস্ত্রি হত্যার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ ৮৫ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৫০০-৭০০ জনকে আসামি করে আরো একটি হত্যা মামলা রুজু হয়েছে।
গত রোববার মামলাটি দায়ের করেন নিহতের বাবা মো. ইনছার আলী (৬৮)। নিহতের নাম মো. মঞ্জু মিয়া (৪৩)। তিনি স্ত্রীসহ বাবার সঙ্গে গাজীপুর মহানগরীর গাছা থানাধীন বড়বাড়ী এলাকায় জয়বাংলা রোডে মোয়াজ্জেম সরকারের বাড়িতে ভাড়া থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
মামলায় কেন্দ্রীয় ও গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে রংপুরের আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাদেরও আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল (৭৬), রংপুরের পীরগাছা-কাউনিয়া এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য টিপু মুন্সি (৭৪), সাবেক মন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা (৭৩), গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খান (৭০), সাবেক প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল (৪৬), গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ (৫৮), কেন্দ্রীয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি মো. সাদ্দাম (৩৫) ও সাধারণ সম্পাদক ইনান (৩৪)।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর পুলিশের গাছা থানার ওসি মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম। তিনি জানান, মামলাটি রোববার রুজু করা হয়েছে। মামলায় মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রসহ বেআইনি জনতাবদ্ধে মারপিট করে গুরুতর জখম করাসহ গুলি করে মানুষ খুন করা ও হুকুম দেওয়ার অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, মামলার বাদী অভিযোগ করেছেন, নিহত মো. মঞ্জু মিয়া গাজীপুর মহানগরীর বড়বাড়ী এলাকায় ভাড়া থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র-জনতার সমাবেশে যোগদানের উদ্দেশ্যে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে গাছা থানাধীন বড়বাড়ী বাজারের সামনের রাস্তায় এসে সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে আসামিরা জ্ঞাত ও অজ্ঞাত উচ্ছৃঙ্খল আসামিদের (কেন্দ্রীয় নেতাদের) নির্দেশ অনুযায়ী বন্দুক, পিস্তল, লাঠি, লোহার রড, রামদা, চাপাতি ইত্যাদি বিভিন্ন মারাত্মক দেশীয় ও আগ্নেয়াস্ত্রে সজ্জিত হয়ে বেআইনি জনতাবদ্ধে গত ২০ জুলাই দুপুর অনুমান ১২টার সময় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করে হত্যার উদ্দেশ্যে উপর্যুপরি কিল-ঘুষি-লাথি মারে, লাঠি ও লোহার রড দিয়ে পিটিয়ে, এলোপাতাড়ি মারপিট করে মো. মঞ্জু মিয়া (৪৩) সহ প্রায় ২৫-৩০ জন আন্দোলনকারীর শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত জখম করে।
একপর্যায়ে উল্লিখিত আসামির নির্দেশে ৬নং আসামি মো. আজমত উল্লাহ খান ও ৭নং আসামি জাহিদ আহসান রাসেল সশরীরে উপস্থিত থেকে ও তাদের হুকুমে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অবৈধ পিস্তল ও বন্দুকধারী এজাহারনামীয় ও অজ্ঞাত নামীয় আসামিরা ছাত্র-জনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়িভাবে গুলি ছুড়তে শুরু করে। ঐ সময় আসামিদের ছোড়া গুলিতে ঘটনার দিন দুপুর অনুমান সোয়া ১টায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী মো. মঞ্জু মিয়ার পেটের বাম পাশে গুলি ঢুকে পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে বাদীর ছেলে গুরুতর রক্তাক্ত জখম অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।
মঞ্জু মিয়ার স্ত্রী মোসা. রহিমা বেগম (৩১) উপস্থিত ছাত্র-জনতার সহায়তায় চিকিৎসার জন্য দ্রুত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মঞ্জু মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার সময় মঞ্জু মিয়া মৃত্যুবরণ করেন।
বাদী আরো জানান, মো. মঞ্জুর গ্রামের বাড়ি রংপুর জেলার পীরাগাছা থানার জুয়ান গ্রামে লাশের দাফন সম্পন্ন করার পর দেশব্যাপী চলমান অস্থিরতার কারণে থানার কার্যক্রম স্থগিত থাকায় সুষ্ঠু ও সঠিক এবং ন্যায় বিচারের স্বার্থে বিবাদীর নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এজাহার দায়ের করতে বিলম্ব হলো।



