প্রধানমন্ত্রী অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করলেন

91
ঢাকা:

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধন করেন।

বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ও ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে শুরু হয়েছে অমর একুশে বইমেলা, ২০২৬। এবারের বইমেলার মূল প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে— ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বইমেলার উদ্বোধন করেন।

এ সময় তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করেন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, বইমেলা শুধু বই বিপণনের স্থান নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে যে ভাষা আমাদের প্রাণ, আমাদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার উচ্চারণ। ভাষা আন্দোলনের চেতনা থেকেই বইমেলার জন্ম।

তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে আমরা যেন বই থেকে বিমুখ না হই। বই জ্ঞানের আলোকবর্তিকা, যা একটি জাতির মানসিক বিকাশ ও মানবিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, নবগঠিত সরকার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা বিস্তার, নতুন লেখকদের উৎসাহ প্রদান, গবেষণা ও অনুবাদ কার্যক্রম উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কোরআন, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়।

জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের পর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’।

স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বাংলা একাডেমি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এ সময় মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে শহীদদের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিতেই এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, সরকারের দৃঢ় প্রত্যয়, মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ ও প্রকাশকদের সহযোগিতায় এবারের বইমেলার আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে।

রোজা ও ঈদের আবহে বইমেলা নতুন অভিজ্ঞতা এনে দেবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. রেজাউল করিম বাদশা ও সংস্কৃতি সচিব মো. মফিদুর রহমান।

উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী মেলার বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। পরে মেলা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

 

May be an image of one or more people, crowd, dais and text

 

মেলা ১৫ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন (ছুটির দিন ছাড়া) বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে।

রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। ছুটির দিনে মেলা চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।

বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, এবারের মেলায় মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। মোট ইউনিট সংখ্যা ১ হাজার ১৮টি। গত বছর অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ছিল ৭০৮টি এবং ইউনিট ছিল ১ হাজার ৮৪টি।

এবারের বইমেলাকে পরিবেশবান্ধব ও ‘জিরো ওয়েস্ট বইমেলা’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতের পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ধূলি নিয়ন্ত্রণ ও মশক নিধনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্টল নির্মাণে পাট, কাপড় ও কাগজসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন এলাকায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বর স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিনের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

শিশুচত্বরে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ১০৭টি ইউনিট নিয়ে অংশ নিচ্ছে। প্রতি শুক্র ও শনিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত ‘শিশুপ্রহর’ পালিত হবে।

প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত সেমিনার এবং ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

এছাড়া শিশুকিশোর চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি ও সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন থাকছে।

নিরাপত্তা নিশ্চিতে মেলাপ্রাঙ্গণে পর্যাপ্ত সংখ্যক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ পুলিশ, র‌্যাব, আনসার ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা।

এছাড়া সেরা প্রকাশনা ও নান্দনিক স্টল সাজসজ্জার জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’, ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’, ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার’ ও ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হবে।

এ বছর নতুনভাবে প্রবর্তন করা হয়েছে ‘সরদার জয়েনউদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার’, যা নতুন অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে গুণগত মানের ভিত্তিতে প্রদান করা হবে।

facebook sharing button
messenger sharing button

সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করবে: প্রধানমন্ত্রী

বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’

তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।  অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয়, বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার।’

আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী একটি সমৃদ্ধ, মেধাভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

May be an image of one or more people, crowd, dais and text

সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।

অনুষ্ঠানে সুরসপ্তকের শিল্পীরা জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন। এরপর বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলা কেবল বই কেনাবেচার মেলা নয়, এটি আমাদের মেধা ও মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই আজকের এই মেলা। ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়।’

এবারের মেলা নির্ধারিত সময়ের কিছুটা পরে শুরু হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটলেও বইমেলার আবেদন বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি। এটি আমাদের মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের এক অবিনাশী স্মারক।’

 

 

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বই পড়ার গুরুত্বের ওপর বিশেষ জোর দেন। জার্মান দার্শনিক মার্কুইস সিসেরোর উক্তি উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো। বিজ্ঞানীদের মতে, বই পড়া মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। অথচ বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বইবিমুখ করে তুলছে। স্ক্রিনে পড়ার চেয়ে কাগজের পাতায় কালো অক্ষরে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করার আবেদন অনন্য।’

আন্তর্জাতিক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘১০২টি দেশের পাঠাভ্যাস জরিপে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। আমাদের নাগরিকরা বছরে গড়ে মাত্র তিনটি বই পড়েন। এই চিত্র আমাদের পাল্টাতে হবে। মেলা যেন শুধু উৎসব না হয়ে আমাদের বইপ্রেমী করে তোলে, এটাই প্রত্যাশা।’

বাংলা একাডেমিকে ভবিষ্যতের জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অমর একুশে বইমেলাকে আগামীতে ‘আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজনের বিবেচনা করতে হবে। এর ফলে আমরা বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হতে পারব। পাশাপাশি জাতিসংঘে বাংলাকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আমরা অব্যাহত রাখব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তর-প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে, ইনশাআল্লাহ।’

 

 

তিনি বইমেলাকে কেবল ঢাকা কেন্দ্রিক না রেখে সারা বছর দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। তরুণ প্রজন্মের মেধা বিকাশে বাংলা একাডেমির গবেষণাবৃত্তি এবং তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আরও সম্প্রসারিত করার নির্দেশনাও দেন তিনি।

বক্তব্যের শেষে প্রধানমন্ত্রী দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেন। এরপর তিনি ফিতা কেটে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমসহ কবি-সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

facebook sharing button
messenger sharing button

বাংলা একাডেমি বইমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য

 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বাংলা একাডেমিতে একুশে বইমেলা উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য নিম্নে দেওয়া হলো-

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

বাংলা একাডেমির আয়োজনে ১৯৭৮ সাল থেকে চালু হওয়া অমর একুশে বইমেলা এখন জাতির মেধা-মননের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে বইমেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও নিয়মের কিছুটা ব্যত্যয় ঘটিয়ে দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এবার নির্ধারিত সময়ের বেশকিছু সময় পর বইমেলা শুরু হয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশেই বইমেলার আয়োজন করা হয়। তবে আমাদের বইমেলা অন্য দেশের বইমেলার মতো নয়। আমাদের বইমেলা আমাদের মাতৃভাষার ভাষার অধিকার আদায় এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্মারক হিসেবে চিহ্নিত। তবে প্রতি বছর মেলার আকার আয়তন বাড়লেও সেই হারে গবেষণাধর্মী বই প্রকাশিত হচ্ছে কিনা, কিংবা মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ছে কিনা এই বিষয়গুলো নিয়েও বর্তমানে চিন্তা ভাবনার অবকাশ রয়েছে।

বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। জার্মান দার্শনিক মারকুইস সিসেরোর একটি উক্তি এখানে আমি খুবই প্রাসঙ্গিক মনে করছি। তিনি বলছিলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো’। বিজ্ঞানী এবং গবেষকরা বলছেন, বই শুধু বিদ্যা শিক্ষা কিংবা অবসরের সঙ্গীয় নয় বরং বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য এক ধরনের ব্যায়াম। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি করে যেটি মানুষের স্মৃতিশক্তি এবং বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি আলঝেইমার ও ডিমেনশিয়ার মতো রোগেরও ঝুঁকি কমায়।

তবে বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বই বিমুখ করে তুলছে। ইন্টারনেটেও অবশ্যই বই পড়া যায় তবে গবেষকরা বলছেন, বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা বই পড়ার মধ্যে যেভাবে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করা যায়, একইভাবে দিনের পর দিন কম্পিউটারের মনিটরে ডুবে থেকে জ্ঞানার্জন সম্ভব হলেও শরীর এবং মনোজগতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবও কম নয়।

যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে জনজীবনে ইন্টারনেট অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে।

প্রিয় সুধীবৃন্দ,

বিশ্বের ১০২ টি দেশের নাগরিকদের পাঠাভ্যাস নিয়ে একটি জরিপ প্রকাশিত হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক সিইও ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিন জরিপের ফলাফল বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা বই পড়ার শীর্ষে রয়েছেন। তালিকার সর্বনিম্নে রয়েছে আফগানিস্তান। বইপ্রেমীদের এই তালিকায় ১০২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। বাংলাদেশের একজন মানুষ গড়ে বছরে তিনটির মতো বই পড়েন। বই পড়ার পেছনে বছরে ব্যয় করেন মাত্র ৬২ ঘণ্টা সময়। সুতরাং অমর একুশে বইমেলা শুধু নিছক একটি উৎসবই হবে না বরং এই মেলা আমাদেরকে আরও বইপ্রেমী করে তুলবে, নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে, আজকের এই বই মেলায় দাঁড়িয়ে এটিই আমার প্রত্যাশা। মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ৫২’র ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা সগৌরবে প্রতি বছর অমর একুশে পালন করি। দিবসটি এখন আর শুধু বাংলাদেশের নয়। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালিত হচ্ছে। ৫২ সালের ভাষা শহীদদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘অমর একুশে বইমেলা’। তবে সময়ের প্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে ‘অমর একুশে বইমেলা’ ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটি আপনারা বিবেচনা করতে পারেন।

‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা এবং সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।

আমি মনে করি, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের এই সময়ে মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি। বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই. এ জন্য আমাদেরকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ হতে হবে।

একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।

প্রিয় সুধীবৃন্দ,

ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয় বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের  সূতিকাগার।

অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার যে আয়োজন করে…এইসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেয়। এভাবেই বইমেলা হয়ে উঠুক আমাদের সকলের মিলনমেলা, প্রাণের মেলা।

বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলায়ও আয়োজিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকগণও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।

প্রিয় সুধীবৃন্দ,

জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এরমধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন। এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরপ্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূলধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারিত হবে ইনশাআল্লাহ। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষায় অনুবাদের কার্যক্রমও বাংলা একাডেমি পরিচালনা করছে।

আমি আশা করি, এ কার্যক্রমও আরও বেগবান হবে এবং আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্ব সাহিত্যের পরিচয় আরো সুদৃঢ় করবে।

সম্মানিত উপস্থিতি,

এ জন্যই আমরা বলি-‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এই দেশকে সকল প্রকার অন্ধকার ও পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করে দল মত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমি আপনাদের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

সবশেষে অমর একুশে বইমেলা ও একুশে অনুষ্ঠানমালা ২০২৬-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

আল্লাহ হাফেজ
বাংলাদেশ জিন্দাবাদ

twitter sharing button

whatsapp sharing button