২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। এর পরপরই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন।

একই সময়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও প্রশাসনিক চাপের অভিযোগও সামনে আসে। দলটির পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়।
আদালতের নির্দেশে তার বক্তব্য প্রচার সীমিত হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি দলীয় যোগাযোগ বজায় রাখেন। দলীয় সিদ্ধান্ত, কৌশলগত পরিকল্পনা ও আন্দোলনের দিকনির্দেশনায় তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতি তুলে ধরতেও তার সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যায় বলে দলীয় সূত্র দাবি করে।
এই আন্দোলনে আধুনিক প্রযুক্তি, ভার্চুয়াল বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে তিনি রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেন। বিএনপির দাবি, বিকেন্দ্রীভূত সাংগঠনিক কাঠামো ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মনির্ভর যোগাযোগের মাধ্যমে আন্দোলনকে ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হয়। তারেক রহমান প্রমাণ করেন, নেতৃত্ব জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন টেকসই ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে।
প্রায় ১৭ বছর বিদেশে অবস্থানের পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরেন। রাজধানীর পূর্বাচলের ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসের গণসংবর্ধনা মঞ্চে তাকে অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। সেখানে তিনি দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। তার ওই বক্তব্য সারা দেশে একটি ইতিবাচক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এ ছাড়া দেশে ফেরার দিন তিনি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেন, দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিন পর বাংলাদেশের আকাশে!’ পোস্টের সঙ্গে উড়োজাহাজের জানালার পাশে তোলা নিজের একটি ছবি জুড়ে দেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টটি ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু দলে নেতৃত্বে শূন্যতা তৈরি করে। পরে গত ৯ জানুয়ারি দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ৩১ দফা ইশতেহার ঘোষণা করে বিএনপি। ইশতেহারে রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়।
নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বিএনপির সাংগঠনিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত সিলেট থেকে তারেক রহমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। পরে তিনি বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় জনসভায় অংশ নেন। নির্বাচনের দুই দিন আগে রাজধানীতে ১৪টি পথসভায় অংশ নিয়ে সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রচারপর্বে তিনি ধর্ম, দল ও মত নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং স্থানীয় সমস্যা ও প্রত্যাশা শোনেন। দলীয় নেতারা দাবি করেন, এই সরাসরি যোগাযোগ ভোটারদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করে এবং নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৭ আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে জয় পায়, যা দলটির জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করে। এই প্রথম তারেক রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় দলটি। তিনি ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে তিনিই প্রধানমন্ত্রী পদে বসছেন।
নির্বাচনের ফলাফলের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন ও গেজেট প্রকাশের পর মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেন। সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানে শপথ বাক্য পাঠ করান দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন।
সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন সরকারের শপথ আয়োজন এই প্রথম। এর মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। এক পরিবারের তিন সদস্য রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরের জন্য তিনি দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন। তার নেতৃত্বে সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা সরকারের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন জুলাই যোদ্ধাদের হাতে গড়ে উঠা নতুন বাংলাদেশকে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, প্রবাসে নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নির্বাচনী বিজয়; সব মিলিয়ে তারেক রহমারের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেশের নজর থাকবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তার নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়, তার দিকে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুলের মতে, তারেক রহমান আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছেন, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তার পরিবার, বিশেষ করে মা খালেদা জিয়া। তিনি শুরু থেকেই ছেলেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতির জন্য প্রস্তুত করেছেন এবং রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে বড় করেছেন। রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির এই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির উদাহরণ অন্যান্য রাজনৈতিক পরিবারে এভাবে দেখা যায়নি।
টুটুল আরও বলেন, ২০০৮ সালে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পর তারেক রহমান চাইলে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে পারতেন, কিন্তু তা করেননি। প্রবাসে থেকেও তিনি দলকে সংগঠিত রাখেন, নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে দলের কার্যক্রম সচল রাখেন। দীর্ঘমেয়াদি এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং জাতীয় নেতৃত্বের পর্যায়ে উঠেছেন।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ সজল বলেন, তারেক রহমান তরুণদের রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সুসংগঠিত করার মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করেছেন। দীর্ঘ প্রবাসেও তিনি নিয়মিতভাবে দলকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং দেশের ভেতরের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নেতাকর্মীদের উৎসাহিত করেছেন। সজল দাবি করেন, তিনি অন্যায় কখনও প্রশ্রয় দেননি এবং দলের নেতাকর্মীদের শিখিয়েছেন কীভাবে অন্যায় ও নিপীড়নের মুখেও রাজনীতিতে টিকে থাকতে হয়।
সজল আরও উল্লেখ করেন, একসময় ক্ষমতাসীন মহল বিএনপির রাজনীতি সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তারেক রহমানের মনোবল, সংগঠন দক্ষতা এবং ধারাবাহিক পরিশ্রমের কারণে দল ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতার ফলেই তিনি এখন জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী খতিব আসলাম বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত ও সক্রিয় রাখতে কৌশলী দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তারেক রহমান। প্রবাসেও তিনি ভার্চুয়াল যোগাযোগ ও বার্তার মাধ্যমে আন্দোলনের গতি ও দিকনির্দেশনা দেন। কঠিন পরিস্থিতিতেও রাজনীতিতে টিকে থাকার দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং দীর্ঘ মেধা ও ত্যাগের বিনিময়ে আজ প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।



