
একই এলাকার রিকশাচালক সাইফুল ইসলাম (৪২) বলেন, নেতা মানে শুধু নির্বাচনের সময় দেখা দেওয়া না। জাহাঙ্গীর ভাইকে আগেও এলাকায় দেখছি। মানুষ বিপদে পড়লে পাশে পাইছে— এইটাই বড় কথা।
ভোটারদের একটি বড় অংশ বলছেন, এই আসনে নিম্ন আয়ের মানুষের সংখ্যা বেশি। তাই তাদের প্রত্যাশা এমন একজন নেতা, যিনি সব পরিস্থিতিতে পাশে থাকবেন এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নাগরিক সমস্যার সমাধান করবেন।
বিএনপি প্রার্থী এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন আমি এই মানুষদের পাশে আছি। জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। ৩২৯টি মামলা নিয়ে আড়াই বছর জেল খেটেছি। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এমপি হলে যানজট, চিকিৎসা সংকটসহ নাগরিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করব। কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়। সহনশীলতা ও শ্রদ্ধাবোধ রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে হবে।

অন্যদিকে, শাপলা কলি প্রতীকের জোট প্রার্থী ও এনসিপি নেতা মো. আরিফুল ইসলামও মাঠে সক্রিয়। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের কোটা আন্দোলন থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলন পর্যন্ত আমি রাজপথে ছিলাম। এই এলাকায় রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ, হাসপাতালের অভাব প্রকট। এমপি হলে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সমন্বয় করে এসব সমস্যা সমাধান করব।
শাপলা কলির সমর্থনে কুড়িল এলাকায় কথা বলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আহনাফ আহমেদ। তিনি বলেন, আরিফুল ভাই নতুন রাজনীতির কথা বলেন। তরুণদের জন্য তার ভাবনাগুলো আলাদা।
দক্ষিণখান এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মিল্লাত হক বলেন, দুর্নীতির বাইরে থেকে রাজনীতি করতে চাইলে নতুনদেরও সুযোগ দেওয়া দরকার। আরিফুলের কথা শুনেছি, ভালো লেগেছে।
শাপলা কলির সমর্থনে আছেন বলে জানান একই এলাকার বাসিন্দা নায়েব আলী (৫৫)। তার মতে, বড় দুই দলের রাজনীতি বহু বছর ধরে দেখেছেন তিনি। এখন তরুণদের সুযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি, আলোচনায় মান্না
এবারের নির্বাচনে ঢাকা–১৮ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতিও আলোচনায়। বিশেষ করে কেটলি প্রতীকের নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না এই আসনে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছেন বলে মনে করছেন ভোটারদের একটি অংশ।
দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন, বড় দুই দলের বাইরে বিকল্প রাজনীতি দরকার। মান্না সাহেব দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্রের কথা বলছেন। তার বক্তব্য আলাদা লাগে।
বিমানবন্দর এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী (৫৫) বলেন, বড় দলগুলোর রাজনীতি অনেক দেখেছি। মান্নার মতো মানুষরা অন্তত সাহস করে কথা বলেন। স্বতন্ত্র হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা আছে।

এই আসনের অন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বড় দলের মতো ব্যাপক প্রচার না চালালেও নিজ নিজ এলাকায় ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও স্থানীয় পরিচিতির ওপর ভর করে ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। রেল ইঞ্জিন প্রতীকের মো. মহিউদ্দিন হাওলাদার এবং হরিণ প্রতীকের মো. ইসমাইল হোসেন উভয়েই স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ হলেও আলোচনায় তারা রয়েছেন তুলনামূলক সীমিত পরিসরে।
সহিংসতার ভয়, ভোটে অনাগ্রহ
উত্তরা ৭ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও বেসরকারি চাকরিজীবী রাশেদ মাহমুদ (৩৮) বলেন, ভোট দিতে চাই, কিন্তু পরিবেশ দেখে ভয় লাগে। আগের নির্বাচনগুলোতে মারামারি, কেন্দ্র দখলের খবর দেখেছি। পরিবার নিয়ে থাকি, ঝুঁকি নিতে মন চায় না।
উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের গৃহিনী নাসরিন আক্তার (৪৬) বলেন, রাজনীতি মানেই এখন সহিংসতা। ভোট দিতে গেলে কী হবে, এই অনিশ্চয়তা থেকেই অনেকেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত না হলে ভোট দিতে যাওয়া কঠিন।

ঢাকা–১৮ আসনটি ২০০৮ সালের আগে অস্তিত্বে ছিল না। নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের পর ২০০৮ সালে প্রথমবার এখানে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাহারা খাতুন বিজয়ী হন। পরে ২০১৪ ও ২০১৮ সালেও এমপি হন। ২০২০ সালে তার মৃত্যুর পর এই এলাকার এমপি হন আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ হাবিব হাসান। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে আসনটি আওয়ামী লীগের দখলেই ছিল।
সব মিলিয়ে, ঢাকা–১৮ আসনে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হলেও ভোটারদের আলোচনায় বিএনপি প্রার্থী এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন আপাতত এগিয়ে রয়েছেন। তবে ভোটার উপস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও নির্বাচনী পরিবেশ শেষ পর্যন্ত ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সচেতন ভোটাররা।



