আজ ঐতিহাসিক মে দিবস

1

 

রক্তে রঞ্জিত অধিকার আদায়ের ইতিহাস আর মেহনতি মানুষের বিজয়ের গৌরব গাথা নিয়ে আবারও ফিরে এলো মহান মে দিবস। আজ ১লা মে; শ্রমজীবী মানুষের শোষণমুক্তির শপথ নেওয়ার দিন।facebook sharing button

whatsapp sharing button
copy sharing button
sharethis sharing button

 

নিউজ২১ডেস্কঃ ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটে যে আন্দোলনের দাবানল জ্বলে উঠেছিল, সেই আগুনেই ভেঙেছিল পরাধীনতার শিকল, প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শ্রমিকের আট ঘণ্টা কাজের ন্যায্য অধিকার। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে এসে আজও বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের ঘাম আর শ্রমের মর্যাদা রক্ষার অঙ্গীকারে পালিত হচ্ছে এই দিনটি। বাংলাদেশেও যথাযথ মর্যাদায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বর্ণাঢ্য র‌্যালি, আলোচনা সভা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে স্মরণ করা হচ্ছে সেই সব বীর শ্রমিকদের, যাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ চাকা ঘুরছে বিশ্ব অর্থনীতির।

জানা গেছে, ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা শ্রমের উপযুক্ত মূল্য ও দৈনিক অনধিক আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ওই দিন আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশ গুলি চালায়। এতে অনেক শ্রমিক হতাহত হন। তাদের আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে দৈনিক কাজের সময় আট ঘণ্টা করার দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর থেকে দিনটি ‘মে দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। মহান মে দিবসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে আজ জাতীয় ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। ‘মহান মে দিবস’ উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, শ্রম ও পেশাজীবী সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এদিকে দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন প্রেসিডন্ট মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ‘এক গৌরবোজ্জ্বল দিন’ বলে মন্তব্য করে প্রেসিডন্ট মো. সাহাবুদ্দিন তার বাণীতে বলেন, ‘দেশব্যাপী যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস পালিত হচ্ছে জেনে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এ উপলক্ষে আমি বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল শ্রমজীবী মানুষকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’

অপর এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মহান মে দিবস এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষের প্রতি জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন। ১৮৮৬ সালের মে মাসে আট ঘণ্টা কর্মদিবসসহ শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায় করতে গিয়ে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে মার্কেটে’ যারা জীবন দিয়েছেন এবং সেই থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বের দেশে দেশে শ্রমজীবী-কর্মজীবী মানুষ যারা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় হতাহত হয়েছেন তাদের প্রত্যেককে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।’
মে দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘সুস্থ শ্রমিক, কর্মঠ হাত, আসবে এবার নব প্রভাত।’ এ প্রতিপাদ্যের অন্তর্নিহিত প্রেরণাকে ধারণ করেই বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস।

 

যেমন করে এলো মে দিবস—মে উৎসব

কেমন করে এলো মে দিবস—মে উৎসব
১৮৮৬ সালে পহেলা মে, দিনটি ছিল শনিবার। ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে এই দিন শিকাগোসহ আমেরিকার সকল শহরের শিল্পাঞ্চলে সফল ধর্মঘট হয়।

আমেরিকার সংবাদপত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী ওই দিনের ধর্মঘটে ৩ লাখ ৪০ হাজার শ্রমিক মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে শিকাগো শহরে মিছিলে অংশ নেন ৮০ হাজার শ্রমিক।
স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রথম দিনে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ সমাবেশ সফল হয়। পরের দিন ছিল ২ মে রোববার, সরকারি ছুটির দিন।

২ তারিখ সরকারি ছুটির পরদিন ৩ মে ধর্মঘট আরও ব্যাপকতা লাভ করে। এতে ভীতসন্ত্রস্ত পুলিশ, মালিকদের দালালরা চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র শুরু করে।
চক্রান্তের অংশ হিসাবে ৩ মে’র শ্রমিক সমাবেশে পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ৬ জনের মৃত্যু হয়।এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৪ মে ‘হে মার্কেট’ স্কয়ারে এক বিশাল শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশ পণ্ড করতে মালিকদের ভাড়াটিয়া গুন্ডারা বোমা নিক্ষেপ করে। তার সঙ্গে শুরু হয় পুলিশের গুলিবর্ষণ। পুলিশের গুলিতে তাৎক্ষণিকভাবে ৪ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। আহত হয় অসংখ্য শ্রমিক। এই অবস্থায় শুরু হয় পুলিশের সাথে শ্রমিকদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। সংঘর্ষে শিকাগোর ‘হে মার্কেট’ রক্তের বন্যায় ভেসে যায়। নিহত হয় ৭ পুলিশও।

ইতিহাসে এই ঘটনা ‘হে মার্কেট ট্রাজেডি’ হিসাবে চিহ্নিত হয়। হত্যাকাণ্ডের পর শিকাগোসহ আমেরিকার শ্রমিকরা ভীতসন্ত্রস্ত না হয়ে তাদের আন্দোলন সংগ্রামকে আরও জোরদার করে। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামী কাফেলাকে আরও এগিয়ে নেয়। শেষ পর্যন্ত এই সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির বিজয় অর্জিত হয়।

এজন্য শ্রমিকদের আরও অনেক রক্ত দিতে হয়েছে। কারণ এই ঘটনায় শ্রমিক শ্রেণির ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। সেই সময় আমেরিকার বিভিন্ন সংবাদপত্র এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে সর্বাত্মক সমর্থন ও মদদ দান করে।

বিভিন্ন সংবাদপত্রে আন্দোলনরত শ্রমিকদের কমিউনিস্ট বর্ণনা করে বলা হয় ‘প্রতিটি ল্যাম্পপোস্ট কমিউনিস্টদের লাশ দ্বারা সজ্জিত করা হোক’। শিকাগো ট্রিবিউন ধর্মঘটী শ্রমিকদের প্রকাশ্যে ফাঁসির দাবি জানায়।

শুধু তাই নয়, শ্রমিকদের খুন করল যারা তাদের বিচার হলো না। বিচার হলো শ্রমিক নেতাদের। বিচার তো নয়, প্রহসন হলো। ৪ শ্রমিক নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হলো। ফিশার, এঞ্জেল, স্পাইজ ও পার্সনস—শ্রমিক শ্রেণির চার বীর নেতা নির্ভীকচিত্তে ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিলেন।

শিকাগোর শ্রমিকদের সেই লড়াই ব্যর্থ হয়নি। আমেরিকার শ্রমিক শ্রেণি তাদের বীরদের ভুলেনি। ভুলেনি বিশ্বের অন্যান্য দেশের শ্রমিক শ্রেণি ও তার নেতৃত্বও। তাইতো ১৮৮৯ সালে ১৪ জুলাই ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে ১লা মে’কে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসাবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত ১লা মে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক সংহতি দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। এই দিবসে সারা দুনিয়ার সর্বত্র এক আওয়াজ উচ্চারিত হয়।

 

—‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’।

মে দিবস-মে উৎসবই একমাত্র উৎসব যা সারা দুনিয়ার সর্বত্র পালিত হয়। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ, এমন কোনো স্থান নেই যে, সেখানে এই দিবসটি পালিত হয় না। তাই আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে মে দিবসের উৎসব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

উল্লেখ্য যে, শুধু আমেরিকার শিকাগোর হে মার্কেট শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয়নি, শ্রমিকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছে আরও অনেক দেশের অনেক শহর-বন্দর-গ্রাম। ১৮৯১ সালে ফরাসি দেশে মে দিবসের অনুষ্ঠানে পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয় ৫০ জনের অধিক শ্রমিক। আহত হয় কয়েকশো। ফরাসি দেশের ফারমিন্স শহরে এই বর্বর শ্রমিক হত্যা সংঘটিত হয়। বিশ্বের দেশে দেশে মে দিবস পালনে পুলিশের বাধা ও হত্যাকাণ্ডের পুরো বিবরণ দিতে গেলে এই লেখার পরিসর বেড়ে যাবে। তাই আপাতত এই বিষয়ের ইতি টানছি।

ইতিহাসের সূচনা পর্ব

১৮৮৬ সালে ১লা মে আমেরিকায় ৮ ঘণ্টা সময়ের দাবিতে প্রথম বিক্ষোভ সমাবেশ ও ধর্মঘট হয়। কিন্তু এই ইতিহাস সংগ্রামের সূচনা হয় আরও আগে, ১৮৬৪ সালে মহামতি কার্ল মার্কস লন্ডনের সেন্ট মার্টিনস হলে অনুষ্ঠিত প্রথম কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের উদ্বোধনী ভাষণে কাজের ঘণ্টা কমানোর দাবি জানান। কার্ল মার্কসের এই দাবির দুই বছর পর ১৮৬৬ সালের আগস্ট মাসে বাল্টিমোরে আমেরিকার ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়নের সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবির প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।

উল্লেখ্য, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধেও ইউরোপ-আমেরিকায় সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত শ্রমিকদের খাটানো হতো। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে, বিশেষ করে আমেরিকায় ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য করা হতো। অবশ্য, আন্দোলনের মুখে মার্কিন সরকার ১৮৩৭ সালে সরকারি কর্মচারীদের কাজের ঘণ্টা নির্ধারণ করে ১০ ঘণ্টা। অর্থাৎ ১০ ঘণ্টা শ্রম দিবস চালু করে। কিন্তু বেসরকারি পর্যায়ে শিল্প শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা পুরোপুরি মালিকদের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়।

ফলে শ্রমিক-কর্মচারীদের ওপর চলতো নির্মম নির্যাতন। এই নির্যাতন থেকে বাঁচতে ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলে। প্রথম ট্রেড ইউনিয়ন হয় যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায়। এই ইউনিয়ন ছিল মেকানিকদের ইউনিয়ন। এরপর একে একে বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে তাদের মজুরি ও কর্মঘণ্টার দাবিতে আন্দোলন সংগ্রাম করে।

এই আন্দোলন সংগ্রামের পরিণতিই হলো ১৮৮৬ সালের ঐতিহাসিক শ্রমিক বিক্ষোভ ও ধর্মঘট। যে ধর্মঘটের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে শ্রমিক শ্রেণির বিজয় গাঁথা ঐতিহাসিক মে দিবস, মে উৎসব